মধ্যবিত্ত! বুক ফাটে তো মুখ ফুঁটে না

0
138

মুহাম্মদ মহরম হোসাইন

সারাবিশ্ব এখন মহামারি করোনাভাইরাসে জর্জরিত। চরম ক্রান্তিকাল পার করছি আমরা। বড় বড় পরাক্রমশালী দেশের রাজা, রাণী, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও আমলা থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত কেউ বাদ যাচ্ছে না এই মরণঘাতি ভাইরাসের আক্রমণ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৭১ হাজার ৬০৭ জন। এরোগে ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার জন। আর আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ১৮৫টি। সবার মধ্যে এখন এক অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়। তাই মৃত্যুভয়ে সবাই বাধ্য হয়ে ঘরবন্দী জীবনযাপন করছে।

আমাদের দেশেও গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে লকডাউন। সরকার জরুরি সেবা ব্যতিত অন্যসব প্রতিষ্ঠানসমূহে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। এ লকডাউনে স্তব্দ দেশ। চর্তুদিকে পিনপতন করুণ হাহাকারের প্রতিধ্বনি। এ করোনাকালে কেমন আছেন আমাদের দেশের মানুষ? কেমন কাটছে তাদের জীবন প্রবাহ? নিশ্চই ভালো থাকার কথাও নই! এর মধ্যেও জীবন চলছে জীবনে নিয়মে। এবার মূল কথায় আসা যাক। আমাদের সমাজে তিন শ্রেণীর মানুষ বসবাস করে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। হঠাৎ আসা করোনার এ বিপর্যয়ে তিনশ্রেণীর মানুষেরই সকল হিসেব নিকেশে তালগোল পাকিয়ে গেছে। তবে এরমধ্য সবচেয়ে বেশি দিশেহারা হয়ে গেছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষগুলো। কারণ এদের আয় সীমিত কিন্তু ব্যয় বেশি। ভুক্তভোগী এসব মধ্যবিত্ত মানুষের চেহারার করুণ দৃশ্য বলে দেয় তারা কেমন আছেন! আর নিম্নবিত্তরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে বেঁচে থাকার তাগিদে জীবন ষুদ্ধে রাজপথে লড়াই করছেন। কারণ একটায় পরিবারের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা। অন্যদিকে বিত্তশালীরা এই দুই শ্রেণীর মানুষ থেকে ভিন্ন। তাদের অটেল আছে জীবিকা নির্বাহের জন্য নেই কোন চিন্তা। ঠান্ডা রুমে সৌখিনতায় কাটছে তাদের জীবন। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে, মধ্যবিত্ত বলতে আমরা কাদের বুঝি?

অনেকের মতে, যারা মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কাজ করে, যাদের আয় নির্ধারিত, যাদের বেতনের বাইরে কোনো আয় নেই তারা মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তের মোটামুটিভাবে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। যেমন, এরা শিক্ষিত, রুচিশীল এবং মননশীল। আছে আত্মসম্মান বোধ। সহজ কথায়, মধ্যবিত্তরা দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করে কিন্তু তারা উচ্চবিত্ত নয়। দেশের উন্নতির সঙ্গে আমাদের দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিআইডিএস-এর গবেষণা মতে, ১৯৯১ সালে মধ্যবিত্তের হার ছিল ৯ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালে মধ্যবিত্তের হার হবে ২৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে এই হার হবে ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের হার ক্রমবর্ধমান। করোনার এদূর্যোগে উচ্চবিত্তরা ভাবলেসহীন জীবন যাপন করছেন। তাদের অভাব নেই। সারা মাসে হয়ত ৫০ কেজি চাল লাগবে, কিনে রাখছে ৩০০ কেজি। যতটুকু ডাল, আলু, তেল, লবণ দরকার, তারচেয়েও বেশি কিনে স্টকে করছে। দরকার নাই, তারপরেও কিনছে। আর নিম্নবিত্তরা সরকারি ত্রাণ, দানশীল ব্যক্তিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাহায্য সহায়তা ও যেকোন কাজকর্ম করে কোন প্রকার জীবিকা নির্বাহ করছেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের মাস শেষে বেতন। চাকরি নেই তো বেতন নেই। কিন্তু পেট তো আর মানে না। চুলায় অনুন জ্বালাতেই হবে। শত অভাব-অনটন মুখ বুজে নিরবে সহ্য করছেন। বিত্তহীনদের মতো যে কোনো কাজকর্ম তারা করতে পারছেন না। কারো কাছে হাত পাতাতো দুরে থাক লোক লজ্জার ভয়ে নিজের অভাবের কথা পর্যন্ত প্রকাশ করেন না। চোখের কোণে জল, তারপরও মুখে হাসি লেগে থাকে তাদের। ক্ষুধার যন্ত্রণায় মরবে তারপরও মধ্যবিত্তরা বলবে না ভালো নেই। যেমন বুক ফাটে তো মুখ ফুঁটে না! এ হলো এখন মধ্যবিত্তদের অবস্হা। এদের জীবনের সব মায়া থাকে কর্মের উপর। জীবনের অর্জিত সব সার্টিফিকেটগুলো তাদের আত্মসম্মানের ধারক ও বাহক।

ইতিমধ্যে অনেক পরিচিতজনের সাথে টেলিফোন করে এ করুণ পরিস্থিতির কথা জানা গেছে। বিল্ডিংএ থাকেন বলে তারা কোন প্রকার ত্রাণসহায়তা পাচ্ছেন না। আমি নিজেও একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে বলবো করোনার এ ক্রান্তিকালে সকল জনপ্রতিনিধিদের সরকারি ত্রাণ বিতরণের সময় নিম্নবিত্তদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের মধ্যে বিতরণের উদ্যেগ নেওয়া দরকার। সেইসাথে সরকার দ্রুত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের নামের লিস্ট তৈরী করে রেশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবী। আর টিসিবি মাধ্যমে ন্যয্য মূল্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী যাতে নিদিষ্ট সময়ধরে সুষ্ঠভাবে বিক্রয় করা হয় তার পদক্ষেপ গ্রহণকরা জরুরী।

কারণ দেখা যাচ্ছে, এ মহামারী করোনাকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, মুনাফাখোর ও মজুদদারদের সক্রিয় সদস্যরা বাজার দর উর্দ্ধমুখী করতে টিসিবি থেকে অসাধু উপায়ে পণ্য ক্রয়করে খুচরা বাজারে তা আবার অধিক দামে বিক্রি করেছেন। এসকল দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হওয়া দরকার।

লেখকঃ সংবাদিক/প্রাবন্ধিক