আওলিয়ায়ে কিরামের পথই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত: আল্লামা ছৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মা.জি.আ.)

0
492

 

নিউজ ডেক্স: রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৪১তম আওলাদ, রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিক্বত হযরতুল আল্লামা আল্হাজ্ব সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মা:জি:আ:) বহুবার বাংলাদেশে আগমন করলেও বাংলাদেশী মিডিয়ার সাথে কথা হয়নি। কিন্তু ২০০৭ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার জশ্‌নে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) এ ছদারত করার জন্য আগমন করেন এবং ৩০ শে মার্চ বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা দৈনিক যুগান্তরকে এক যুগান্তকারী সাক্ষাৎকার প্রদান করেন, যা সকলের জ্ঞাতার্থে দৈনিক যুগান্তরের সৌজন্যে তুলে ধরলাম।
দৈনিক যুগান্তর: ২৬ মার্চ ছিল আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে এই দিনে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এদেশের আমজনতার উপর নৃশংস, ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছিল। তারপর দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে আমারা প্রতিক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করি। আপনি পাকিস্তানের একজন নাগরিক হিসাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
হুজুর কেবলা: তৎকালীন শাসকগোষ্ঠি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর যে জুলুম চালিয়েছিল তা ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা হিসাবে স্বীকৃত। এ স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জালেম, স্বৈরচারী শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে মজলুম নিপীড়িত বঞ্ছিত মানুষের জুলুমের শোষণ থেকে মুক্তির পবিত্রতম স্বাধীকার আন্দোলন। আপনাদের এ স্বাধীনতার লড়াই সন্দেহাতীতভাবে মজলুমের আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠার পবিত্রতম লড়াই।
দৈনিক যুগান্তর: এ যুদ্ধ তো সংঘটিত হয়ে ছিল জালেম ও মজলুমের মধ্যে। তাই আমাদের জানতে ইচ্ছে করে সে সময়কার পাকিস্তানের আলেমদের ভূমিকা কী ছিল?
হুজুর কেবলা: পাকিস্তানের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম আল্লামা শাহ আহমদ নূরানী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে অবর্ণনীয় জুলুম করা হয়েছে, তা সত্যিই ন্যাক্কারজনক ও ঘৃণ্য। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাঘরিষ্ঠ লোক যখন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিল, তখন তাদের দাবী মেনে নেয়া উচিত ছিল এবং তাদের প্রতি অন্যায়, জুলুম করে তারা মানব ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে কলংকিত করেছে।
দৈনিক যুগান্তর: পাকিস্তানের তখনকার ভূমিকার জন্য আপনি কি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাপ্রার্থী?
হুজুর কেবলা: কেন? পাকিস্তান কতৃপক্ষকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেন। অন্যায় যে করেছে, সে ক্ষমা প্রার্থী হবে। ক্ষমা পাকিস্তান কতৃপক্ষ চাইবে। জুলুম যে করবে, সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। জুলুম করবে একজন, ক্ষমা প্রার্থনা করবে আরেকজন। এটা তো শরীয়তসম্মত নয়, জায়েজও নয়। আপনারা কি বলেন?
দৈনিক যুগান্তর: প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে আপনার আগমনকে কেন্দ্র করে অসংখ্য মুরিদ, আশেকান ও ভক্ত বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন করে। ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) সর্ম্পকে সাধারণ পাঠকের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন?
হুজুর কেবলা: ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) আমাদের জন্য শুকরিয়ার বিষয়। আল্লাহ আমাদের উপর অনেক বড় রহমত দান করেছেন, তিনি আমাদের মাঝে তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। হুজুর করীম (দ:) রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে শুভাগমন করেন। তিনি সমগ্র সৃস্টির জন্য রহমত স্বরুপ এই ভূ-পৃষ্টে পদার্পন করেন। তাই তার শুকরিয়া আদায় করা আমাদের প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। আমার মুর্শিদে করিম আল্লামা তৈয়ব শাহ (রহ:) ছিলেন রাসূলের ৪০ তম অধ:স্তন পুরুষ, আওলাদে রাসুল। আওলাদে রাসুলদের কাজ হল মানুষকে সিরাতে মুস্তাকিম-সঠিক পথ প্রদর্শন করা। এই ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) নাজাতের অন্যতম একটি উসিলা। আল্লাহপাক কোরআন মাজিদে ইরশাদ করেন, আপনি আল্লাহর অনূগ্রহ ও রহমত দ্বারা সিক্ত হয়ে বলুন,”তারা যেন অনন্দ উপভোগ করে এটা তাদের কাছে সঞ্চিত বস্তুর চেয়ে কল্যানকর।” পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক নবীকে রহমত দ্বারা ভূষিত করে তাকে নিয়ে আনন্দ উদযাপনের র্নিদেশ দিয়েছেন। রাসূল (দ:) আল্লাহর রহমত হওয়ার কারণে তাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা, তাকে কেন্দ্র করে জশ্‌নে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা অনুষ্টান এসব কিছুই শরীয়তসম্মত এবং কোরআনের র্নিদেশ। এ লক্ষ্যে আমরা প্রতি বছর বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন করে থাকি।
দৈনিক যুগান্তর: সিরাতুন্নবী (দ:) ও ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) এর মধ্যে পার্থক্য কী?
হুজুর কেবলা: এটা মিলাদের মাস। কারণ, রাসুল (দ:) এ মাসে শুভাগমন করেন। সিরাতুন্নবী কাকে বলে এ প্রশ্নের উত্তরে আমি আপনাদের ঢাকা আলিয়ার হেড মুদাররিস (অধ্যক্ষ) আল্লামা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ আমিমুল ইহসানের (রহ:) রেফারেন্সে বলতে চাই, তিনি তার রচিত কাওয়ায়েদুল ফিকাহ গ্রন্থে লিখেছেন, সিরাতুন্নবী অর্থ হল রাসুলের যুদ্ধজীবন। ফিকাহর কিতাব সমুহে কিতাবুস সিয়ার অধ্যায়ে রাসুলের (দ:) যুদ্ধ জীবন সংক্রান্ত আলোচনা স্থান পেয়েছে। সিরাতুন্নবী রাসুলের (দ:) জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট অংশ। তিনি ইসলামের প্রচার প্রসারের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেছেন। মুসলমানদের ওপর যুদ্ধ করা ফরয, তবে তা ঐ সময়ে যখন কোন কাফের রাষ্ট্র কর্তৃক মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচিত হয় বা তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। মিলাদুন্নবী দুটি শব্দের সমষ্টি। মিলাদ অর্থ আগমন। নবী অর্থ রাসুল (দ:)। মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর আগমন। আর জশ্‌নে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) আয়োজন কোরআন-সুন্নাহ র্নিদেশিত ও শরীয়ত সম্মত।
দৈনিক যুগান্তর: পাক ভারত উপমহাদেশের আলেম সমাজ সিরাতুন্নবী ও মিলাদুন্নবী প্রশ্নে দু’দলে বিভক্ত।এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অধিকাংশ আলেম সিরাতুন্নবী সমর্থক। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
হুজুর কেবলা: পাকিস্তানের অধিককাংশ আলেম সিরাতুন্নবী সর্মথক, এ তথ্য সঠিক নয়। বরং অল্প সংখ্যক আলেম এ সপক্ষে রয়েছেন। আর গোটা বিশ্বে সরকারী পর্যায়ে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপিত হয়ে থাকে। এমনকি বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:) পালিত হয়। পৃথিবীর কোন দেশে সিরাতুন্নবী উদযাপনের রেওয়াজ নেই। আরব আমিরাতে পর্যন্ত সিরাতুন্নবী পালনের রেওয়াজ নেই।
দৈনিক যুগান্তর: কিন্তু আমরা জানি, সিরাতুন্নবী মানুষের প্রতিদিন প্রতিক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। আর মিলাদুন্নবী নিছক রাসুলের (দ:) জম্ম দিবসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেহেতু সিরাতুন্নবী মিলাদুন্নবী তুলনায় ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, তাই সিরাতুন্নবী পালন ও বাস্তবায়ন কি অধিক যুক্তি সম্মত নয়?
হুজুর কেবলা: সিরাতুন্নবীকে কেন্দ্র করে ফকিহগণ অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারা বলেছেন, সিরাত শব্দটি যখন নবী শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সিরাতুন্নবী হবে তখন তার দ্বারা রাসুলের (দ:) যুদ্ধজীবন বোঝাবে। সেই অর্থে সিরাতুন্নবী রাসুলের (দ:) জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট অধ্যায়। সর্বোপরি তথা নবীর শুভাগমন যদি না ঘটত তবে সিরাতুন্নবী কিভাবে হতো। তাই নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতসহ গোটা ইসলাম নির্ভর করছে আমার নবীর মিলাদের ওপর। সুতরাং সিরাতুন্নবী ব্যাপক ও বিস্তৃত এ বক্তব্য সঠিক নয়। তাই মিলাদুন্নবী (দ:) উদযাপনের মাধ্যমে আমাদের আনন্দ প্রকাশ করা কর্তব্য।
দৈনিক যুগান্তর: হাদিসে এসেছে, শেষ জমানায় এ উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং একটি মাত্র দল ছাড়া বাকি সব দল বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট রূপে গণ্য হবে। প্রশ্ন হল মুসলমানের আল্লাহ, রাসুল (দ:), কোরআন ও কিবলা এক ও অভিন্ন। সব মুসলমানই তাওহীদ বা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তা সত্ত্বেও ৭৩ দলে বিভক্ত হওয়ার কারণ কি?
হুজুর কেবলা: এ প্রশ্নতো নবীর কাছে করা উচিত ছিল। কারণ, তিনি যখন বলেছেন, মুসলমান ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে যাবে, তার কারণ তিনিই সমাধিক জ্ঞাত। তথাপি প্রশ্ন যেহেতু হয়েছে তাই বলছি, নবী বলেছেন মুসলমান ৭৩ দলে বিভক্ত হবে এবং একটি মাত্র দল জান্নাতি হবে, যে দলে আমি এবং আমার সাহাবাগণ থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরামের অনুসারী হক্কানী পীর আউলিয়াগণ এ দলের অর্ন্তভূক্ত।
দৈনিক যুগান্তর: কোন জামাত বা দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অর্ন্তভূক্ত বলে মনে করেন?
হুজুর কেবলা: ঐ জামাত বা দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অর্ন্তভূক্ত, যে জামাতে আবদুল কাদের জিলানী, খাজা গরীবে নেওয়াজ, শাহ আলী বাগদাদী, শাহ জালাল ইয়ামনী (রহ:) সহ হক্কানী পীর আউলিয়ায়ে কেরাম রয়েছেন।
দৈনিক যুগান্তর: ওহাবী, সুন্নী, রেজভী, বেরলভী প্রত্যেকই নিজেদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পতাকাবাহী হিসাবে দাবী করে। এখন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরিচয় জানা কিভাবে সম্ভব হবে?
হুজুর কেবলা: ইতিপূর্বেও আমি বলেছি, আপনাকে দেখতে হবে আবদুল কাদের জিলানী, খাজা গরীবে নেওয়াজ, শাহ আলী বাগদাদী, শাহ জালাল ইয়ামনী (রহ:) কোন জামাতে আছে। শুধু দাবী দিয়ে কাজ হবে না। বরং, এর স্বপক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। অতএব, যে জামাতে তারা থাকবেন, তাদের দেখেই চিনতে পারবেন।
[তথ্যসুত্র: দৈনিক যুগান্তর]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here