মি’রাজ: স্রষ্টা ও সৃষ্টির অপূর্ব মেলবন্ধন

0
130

মোহাম্মদ নূরুল মোস্তফা: মি’রাজ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ ওপরে উঠার সিঁড়ি বা সোপান। মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় বান্দা বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফাকে (দ.) ঊর্ধ্বলোকে তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। সে ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে মিরাজুন্নবী (দ.) বা নবী (দ.) এর মিরাজ তথা ঊর্ধ্বগমন বলে খ্যাত। মিরাজের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে আরবি ‘ইসরা’ শব্দ ব্যবহার করেও আল কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘পবিত্র ও মহামহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের আঁধারে ভ্রমণ করিয়েছিলেন ‘মসজিদুল হারাম’ বায়তুল্লাহ হতে ‘মসজিদুল আকসা’ বায়তুল মুকাদ্দাসে, যার পরিবেশ আমি আল্লাহ বরকতময় করেছিলাম তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য।’ এই আয়াতে নবী করীম (দ.)-এর মি’রাজের সীমানা বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত বলা হলেও অন্য আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বগমন করে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। বহু তাফসিরকারকের মতে, আল্লাহর বাণী ‘তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলি দেখেছিলেন।’ (৫৩:১৮) মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল নবী করীম (দ.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তাঁর মক্কী জীবনের শেষ দিকে। অবশ্য এর সঠিক তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, হিজরতের তিন বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে (অর্থাৎ আজকের দিবাগত রাতে) তিনি জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে ‘বোরাক’ নামক বাহনযোগে মক্কা মুকাররমা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়েছিলেন এবং সেখানে সব নবী-রাসূলের ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করে সশরীরে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। আল কুরআনের পাশাপাশি বহুসংখ্যক বিশুদ্ধ হাদিসেও মিরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মি’রাজের বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকীদা ব্যাখ্যা করে ইমাম আবু হানিফা (র.) বলেন ঃ ‘মি’রাজের সংবাদ সত্য। যে তা প্রত্যাখান করবে সে বিদ’য়াতী ও বিভ্রান্ত।’ আবু হানিফার আকীদা ব্যাখ্যা করে ইমাম তাহাভী (র.) বলেন ঃ মি’রাজের ঘটনা সত্য নবী (দ.)-কে রাতে ভ্রমণ করানো হয়েছে। তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে প্রথমে আকাশে উঠানো হয়, পরে উর্ধ্বজগতের যেখানে আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছা ছিল সেখানে নেয়া হয়। তথায় আল্লাহ তা’য়ালা যা ইচ্ছা ছিল তা দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন এবং তাঁর প্রতি যে বার্তা দেয়ার ছিল তা প্রদান করেন। রাসূল (দ.) এর অন্তর মিথ্যা বলে নি যা তিনি দেখেছেন। আকলী দলিল ঃ বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা যেখানে তাদের চেষ্টা ও জ্ঞানের মাধ্যমে চন্দ্রগমন এমনকি মঙ্গল গ্রহে পর্যন্ত গমন করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বিশ্ব ¯্রষ্টা ও মহা বিজ্ঞানী আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষে তাঁর প্রিয় মানুষটিকে উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ও ফিরিয়ে আনা মোটেও আশ্চর্যের বিষয় নয়। কারণ,আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আধুনিক বিজ্ঞান সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে যে, জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে এরূপ অলৌকিক নৈশভ্রমণ ও উর্ধ্বারোহণ অসম্ভব নয়। মি’রাজের ঘটনাবলীর মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে আরো অনেক মু’জিযার সন্ধান পেয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞানীরা। হাদিসগুলোর মর্মানুযায়ী মি’রাজের রাতে নবী করীম (দ.) কাবা ঘরের হাতিম অংশে কাত হয়ে শুয়েছিলেন। এমন সময় ফিরিশতা জিব্রাইল (আ.) তাঁর কাছে এসে তাঁর বক্ষবিদারণ করেন এরপর তিনি তাঁর কলব বের করে তা ধৌত করলেন। কলব ধৌত করার পর তা ঈমানে পরিপূর্ণ করে আবার তা তার নিজস্ব জায়গায় প্রতিস্থাপন করেন। প্রতিস্থাপনের পর জমজমের পানি দ্বারা তাঁর পেট ধৌত করে বোরাক নামক এক তড়িৎ যানে তাঁকে আরোহণ করানো হয়। এরপর হজরত জিব্রাইল (আ.) তাঁকে নিয়ে বোরাকযোগে ঊর্ধ্বলোকে রওনা হলেন। প্রথম আসমানে যাওয়ার পর দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো আপনি কে? বললেন, আমি জিব্রাইল (আ.) এবং আমার সাথে নবী মুহাম্মদ (দ.)। আবার জিজ্ঞেস করা হলো তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? জিব্রাইল (আ.) বললেন, হ্যাঁ। তখন তাঁকে খোশ আমদেদ বলে ভেতরে নেয়া হলো। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন হজরত আদম (আ.) রয়েছেন। জিব্রাইল (আ.) তখন তাঁকে বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা হজরত আদম (আ.), তাকে সালাম করুন। তিনি তখন তাঁকে সালাম করলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে নবী মুহাম্মদ (দ.)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘নেককার পুত্র ও নেককার নবীর প্রতি আমার সাদর সম্ভাষণ। এরপর আল্লাহর পেয়ারা হাবীব হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যায়ক্রমে,দ্বিতীয় আসমানে হজরত ঈসা (আ.) ও হজরত ইয়াহিয়া, তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.),চতুর্থ আসমানে হজরত ইদ্রিস (আ.),পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.),ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাক্ষাৎ করে। সপ্তম আকাশ ভ্রমণের পর হজরত জিব্রাইল নবী মুহাম্মদ সাঃ-কে নিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গেলেন। সেখানে তাঁকে বায়তুল মামুর পরিদর্শন করানো হলো। সেখানে নবী করীম সাঃ স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করেন। এরপর নবী করীম সাঃ-এর সামনে একপাত্র মদ, একপাত্র দুধ এবং একপাত্র মধু আনা হয়। তিনি এর মধ্য থেকে দুধের পাত্রটি গ্রহণ করেন। তখন হজরত জিব্রাইল আঃ বললেন, এটা ফিৎরত বা স্বভাব ধর্মের নিদর্শন। আপনি এবং আপনার উম্মত এই স্বভাব ধর্ম ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। এরপর নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সাঃ-এর ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো। পরবর্তীতে পুনঃ পুনঃ আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহপাক দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতে মুহাম্মদির ওপর ফরজ করেন। করো মতে নবী করীম সাঃ-এর মিরাজ দৈহিক ছিল না। তা ছিল স্বপ্নযোগে। কথাটা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা তাই যদি হতো তবে তাতে আশ্চর্যের বিষয় কী ছিল? স্বপ্নে তো অনেকেই অনেক কাজ করে থাকে। তাতে তো আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকে না। সুতরাং এটা দিবালোকের মতো সত্য যে, নবী করীম (দ.)-এর মিরাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হয়েছিল এবং তা পরদিন নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করার কারণে হজরত আবু বকর রাঃ ‘সিদ্দিক’ উপাধি পেয়েছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতেও সশরীরে নবী করীম সাঃ-এর মিরাজ সম্পূর্ণ সম্ভব। গতি বিজ্ঞান স্থির করেছে, পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুকে যদি প্রতি সেকেন্ড ৬.৯০ অর্থাৎ মোটামুটি সাত মাইল বেগে ঊর্ধ্বলোকে ছুড়ে দেয়া যায়, তবে তা আর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং আধুনিক বিজ্ঞানের এই সূত্র প্রমাণ করে, মিরাজ সংঘটন সম্পূর্ণ সম্ভব এবং বাস্তব। তা ছাড়া আধুনিক যুগে মানুষ যেখানে মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছে সেখানে গোটা বিশ্বজগতের মহান সৃষ্টিকর্তা তার প্রিয় নবী বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাঃ তাঁরই সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন তাতে বাধা কোথায় আল্লাহ্ধসঢ়; আমাদেরকে মি’রাজের মর্ম অনুধাবন করে তদনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here