রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ চাই

0
96

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন: রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের মহিমায় ঘেরা মাহে রমজান আমাদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত। আর কিছুদিন পরেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণও সিয়াম সাধনায় নিমগ্ন হবেন। রমজান মাসের আগমনকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর জন্য তৎপর থাকে যা অত্যন্ত ঘৃনিত এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রমজান মাস আসলে ধনী-গরীব সকলেই একটু ভালো খাবারের প্রত্যাশা করে এটাই স্বাভাবিক। সিয়াম পালনের উদ্দেশ্যে সেহেরীতে একটু ভালো খাবার এবং ইফতারেও বিভিন্ন ধরনের ফল-ফলাদি সহ পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন এবং এটি প্রত্যাশা করাও অযৌক্তিক নয়।

সরকারী এবং অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবিরাও রমজান মাসে বিশেষ বোনাস পেয়ে থাকেন যাতে কওে সচ্ছলতার সহিত রমজানের সিয়াম পালন করতে পারেন। কিন্তু যারা সাধারণ খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় দ্রব্যমূল্যেও উর্ধ্বগতি। এমনিতেই তারা প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদা মিটাতে হিমশীম খায় তার উপর রমজান মাস আসলে প্রতি বছর দ্রব্যমূল্যের চড়া দামে তাদের জীবনকে আরো কঠিন কওে তুলে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে রমজান আসলে বড় বড় শপিং মল গুলোতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উপর বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে যাতে করে সাধারণ জনগন সাচ্ছন্দ্যে সিয়াম সাধনা করতে পারেন।

কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রমজান যত ঘনিয়ে আসে লোভী ও প্রতারক ব্যবসায়ী চক্র অধিক ও অবৈধ মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য মওজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পণ্য সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দেয়। এই অসাধু ব্যবসায়ীরা দেশব্যাপী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে যাতে করে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে। অথচ এটি যেমন রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ তেমনি করে ধর্মীয়ভাবেও বিরাট গর্হিত কাজ। যেমন মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন-”কোন ব্যক্তি মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ ঘটালে কিয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগুনের হাঁড়ের উপর বসিয়ে তাকে শাস্তি দিবেন” (তিরমিযি)। অথচ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবসায়ী মুসলিম হয়েও রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা করে অনৈতিকভাবে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসব ব্যবসায়ীদেও অনেকেই আবার রমজান মাসে রোজাও রাখেন অথচ কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্ঠির মতো পাপের কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেননা বা রাখার চেষ্টা করেনা যা সত্যিই অনুশোচনার বিষয়। আমরা যারা ব্যবসায়ী তাদেরও ভাবতে হবে আমরা প্রথমে মানুষ তারপর ব্যবসায়ী। রমজানের মতো এরকম একটি ফযিলতের মাসকে সামনে রেখে কেন আমরা এই অমানবিক কার্যে লিপ্ত হই? আমাদের বিবেক, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এগুলি কি আমরা ভুলে গেছি? মনে রাখবেন- ”সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক এবং শহিদগণের সাথে থাকবে”(তিরমিযি-১২০৯)। অন্য এক হাদিসে রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন-”কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা অপরাধী হিসেবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে, নেকভাবে সততা ও ন্যায় নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করবে তারা ব্যতীত।” মওজুদদারি করে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের দাম বাড়ানো অত্যন্ত ঘৃণিত অপরাধ। তাই সুযোগসন্ধানী, মওজুদদার, মুনাফাখোর এইসব অসৎ ব্যবসায়ীদের দুষ্ট চক্রকে রুখে দিতে সরকারকে কার্যকরভাবে তৎপর হতে হবে অন্যথায় মাহে রমজানের প্রাক্কালে কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্যের মূল্য বৃদ্ধি করবে এবং অনৈতিক ফায়দা লুটে নেবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি দায়িত্ব নিয়ে এখন থেকে বাজার মনিটরিং করে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদেও বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় তাহলে হয়তো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং অসাধু সিন্ডিকেট কতৃক অহেতুক বাজার দর বৃদ্ধি করা সহজ হবেনা। শুধু ঢাকা শহরের বড় বড় বাজারে মনিটরিং করে দায়িত্ব শেষ করলেই কিন্তু হবেনা। দেশের প্রধান প্রধান প্রতিটি বাজার থেকে শুরু করে মফস্বল শহর গুলোতেও মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং আড়তগুলোর প্রতিও বিশেষ নজর রাখতে হবে। শুধু তাই নয় সরকারের উচিত হবে আমদানী কারক, আড়তদার, ব্যবসায়ী সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে আলোচনা করা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারদর অস্থিতিশীল করা যে দন্ডনীয় অপরাধ তা দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেয়া।

মওজুদদারী করে নিত্য পণ্যের দাম বাড়ানো যে অনৈতিক ও অপরাধমূলক গর্হিত কাজ তা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার করা এবং এটার সাথে যে ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরাট সম্পর্ক রয়েছে তা দেশের আলেমগণকে দিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় নিয়ে আসা উচিত যাতে করে এই অন্যায় কাজ সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের মনে নৈতিকতার উদ্রেক হয়। বেশি বেশি করে নায্য মূল্যের দোকান প্রতিষ্ঠা করা, আভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবিচ্ছিন্ন রাখা, রমজান মাসে যে সব পণ্যের চাহিদা বেশি সেসব পণ্যের ঘাটতি থাকলে তা আমদানীপূর্বক ঘাটতি পূরণ করা, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বা ঘুষ কঠোর হস্তে দমন করা সহ বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here