আজ পবিত্র লাইলাতুল বরাত

0
107

পবিত্র কুরআনুল কারীমে লাইলাতুল বরাতঃ
লায়লাতুল ক্বদরের কথা ক্বোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যেমন: আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
انا انزلنه فى ليلة القدر নিঃসন্দেহে আমি সেটা ক্বদরের রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বদরের রজনীর কথা স্পষ্টাকারে উল্লেখ করেছেন। যদিও শবে বরাতের বিষয়ে স্পষ্টভাবে লেখা নেই। তবে ক্বোরআন মজীদের সূরা দুখানের আয়াতে ‘‘লায়লাতিম্ মুবারাকাতিন্’’ দ্বারা ‘শবে বরাত’ বুঝানো উদ্দেশ্য। কারণ ‘লায়লাতুল মুবারাকা’ও এর একটি নাম। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
حم- وَالْكِتَابِ الْمُبِيْنِ اِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِىْ لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ اِنَّا كُنَّا مُنْذِرِيْنَ فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيْمٍ –
তরজমা: হা-মী-ম। সুষ্পষ্ট কিতাবের শপথ, নিঃসন্দেহে আমি একে (ক্বোরআন মজীদ) নাযিল করেছি এক বরকতময় রজনীতে, নিশ্চয়ই আমি ভীতি প্রদর্শনকারী, উক্ত রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। মুফাস্সিরকুল শিরমণি হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস, হযরত ক্বাতাদাহ্, হযরত মুজাহিদ, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত ইকরামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমসহ অনেক সাহাবী ও তাবে‘ঈর মতে ‘লায়লাতুন্ মুবারাকাহ্’ দ্বারা চৌদ্দ-ই শা’বান দিবাগত রাত তথা শবে বরাত বুঝানো হয়েছে।
[সূরা: দুখান, আয়াত ১-৬]
قال ابن عباس رضى الله عنه حم اى قضى الله ما هو كائن الى يوم القيامة والكتاب المبين يعنى القران فى ليلة مباركة هى ليلة النصف من شعبان وهى ليلة البرأة ـ
অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, হা-মীম। আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে তা নির্ধারণ করেছেন, সুষ্পষ্ট কিতাবের শপথ, অর্থাৎ আল্ ক্বোরআন। আর ‘লায়লাতুম্ মুবারাকা’, তা হল শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত। আর তা-ই লায়লাতুল বরাত।
[তাফসীরে-ই দুররে মানসূর: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০১]
সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর সৌন্দর্যের বরকত আরশের প্রতিটি কণা হতে ভূতলের গভীরে পৌঁছে শবে ক্বদরের মতই।
الليلة المباركة كثرة خيرها وبركتها على العالمين تنزل فيها وان كان بركات جماله تعالى تصل كل ذرة من العرش الى الثرى كما فى ليلة القدر-
[তাফসীরে রহুল বয়ান: ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০১]
লায়লাতুর রহমত বলার কারণ হচ্ছে- এ রাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিল হয়, লাইলাতুল বরাত এ জন্য বলা হয় যে, খাজনা আদায়কারী খাজনা পাওয়ার পর যেভাবে ছাড়পত্র দিলে খাজনা দানকারী সব ধরনের শাস্তি হতে মুক্তি পায়, অনুরূপভাবে এ রাতে বান্দা গুনাহ মুক্ত হয়ে সকল পাপের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে নিজেকে মুক্ত করে।
[তাফসীরে রহুল বয়ান: ৪ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৪]
ان فى هذه الليلة يفصل كل أمر صادر بالحكمة من السماء فى السنة من اقسام الحوادث فى الخير والشر والمحن والمنن والمفرة والهزيمة والحف والتحط فكذا الحجب والجذب والوصل والفصل والوفاق والخلاف والتوفيق والخذلان والقبض والبسط والستر والتملى فكم بين عبد نزلة الحكم والقضاء بالشغاء والبعد اخر ينزله حكمه بالوفاء والرفه-
অর্থাৎ নিশ্চয় এ রাতে আসমান হতে প্রজ্ঞাময় সকল নির্দেশের বার্ষিক তাফসিল ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে কল্যাণ ও অকল্যাণের সব ঘটনা, দুর্ভাগ্য ও সমৃদ্ধি, জয়, পরাজয়, স্বচ্ছলতা ও দুর্ভিক্ষ, অনুরূপভাবে বিকর্ষণ ও আকর্ষণ বন্ধন ও বিচ্ছেদ, ইতিবাচক ও নৈতিবাচক, শক্তি ও অপমান সংকীর্ণতা ও প্রশস্থতা, গোপনীয়তা ও প্রকাশমান সব কিছুর বহিঃপ্রকাশের মোক্ষম সময়। আল্লাহর কত বান্দাই না আছে যাদের জন্য দুর্ভাগ্যের ও দূরত্বের আদেশ অবতীর্ণ হয়। আবার এমন কিছু বান্দা আছে যাদের প্রতি বিশ্বস্ততাও বদান্যতার ফয়সালা অবতীর্ণ হয়। [প্রাগুক্ত]
পর্যালোচনা
সূরা দূখান ও সূরা ক্বদর উভয়টি মক্কা মুকাররামায় অবতীর্ণ হয়। উভয় সূরায় ‘আনযালনা’ (اَنْزَلْنَا) এরশাদ হয়েছে, যার অর্থ: এক সাথে নাযিল করা। উভয় আয়াতের সামাঞ্জস্য হল সূরা দুখানের ‘লায়লাতুল্ মুবারাকা’য় ক্বোরআন মাজীদ আল্লাহর ‘ইলমে আয্ল’ হতে লৌহে মাহফূজে অবতীর্ণ হয়েছে আর লায়লাতুল ক্বদর দ্বারা লৌহে মাহফূজ হতে বায়তুল ইজ্জতে এক সাথে নাযিল হয়েছে। অথবা লায়লাতুম্ মুবারাকায় লৌহে মাহফুজ হতে বায়তুল ইজ্জতে আর লায়লাতুল ক্বদরে বায়তুল ইজ্জত হতে প্রথম আসমানে নাযিল হয়েছে। সূরা দূখানে বরকতময় রজনী দু’টির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। ১. ক্বোরআন নাযিল করা, ২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত করা, তবে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, শবে বরাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা করা হয়। তাই انا انزلناه فى ليلة مباركةএর মাঝে বরকতময় রজনী দ্বারা শবে বরাত নেয়াই উত্তম। আল্লামা আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি উক্ত মতের সমর্থক।
হাদীসে শবে বরাত
শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিনগত রাত শবে বরাত ও ইবাদত বন্দেগী, যিকির-আযকারের রাত। এতে কোন সন্দেহ নেই। অসংখ্য হাদীস শরীফ ও রসূলে করীমের সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমল শরীফ থেকে তা প্রমাণিত।
এক. এ রাতে দোআ কবুল হয়। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান-
عن عثمان بن ابى العاص عن النبى صلى الله عليه وسلم قال اذا كان ليلة النصف من شعبان ينزل فيها الى السماء الدنيا مناد ينادى هل من مستغفر فاغفرله هل من سائل فاعطية فلايسأل احد الا اعطى الا زانية بفرجها او مشرك- (رواه البيهقى)
অর্থাৎ হযরত ওসমান বিন আবুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে প্রথম আকাশে একজন ঘোষক অতবরণ করে ঘোষণা দিতে থাকেন- কেউ ক্ষমা চাওয়ার আছ কি? চাইলেই ক্ষমা করা হবে, কার কী চাওয়ার আছে? তাকে দেওয়া হবে। যা চাওয়া হবে তা-ই দেয়া হবে শুধু যিনাকারী ও আল্লাহর সাথে শরীককারী ব্যক্তি এ সৌভাগ্য লাভ করে না।

হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহ রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়তো অন্য বিবিগনের হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে (মদিনার কবরস্থান) পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে আসলে তিনিও ফিরে এসে আমাকে বললেন, আপনি কি মনে করেছেন, আল্লাহ আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন! আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো অপর কোন হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মধ্য শা’বানের (অর্থাৎ ১৪ তারিখ দিবাগত রাত) রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে জিবরীল আঃ ও ফেরেশতাদের অবতরণ করান । অতঃপর তিনি বনী কালবের(সে সময়ের সবচেয়ে বড় মেষপালন গোত্র, যাদের সহস্রাধিক মেষ ছিলো) মেষের গায়ে যতো পশম রয়েছে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।” ( ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন (৬/২৩৮), তিরমিযি তার সুনানে (২/১২১,১২২), ইবনে মাজাহ, রযীন, মিশকাত )।
.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here