কুরআন সুন্নাহর আলোকে “শবে বরাত”র গুরুত্ব (৭)

0
124

নফল নামায
শবে বরাতে নফল ইবাদত-বন্দেগী করা অতি উত্তম। যত বেশী ইবাদত, যিকির-আযকার, তেলাওয়াতে ক্বোরআন করবে, তত বেশী সওয়াব পাবে। তবে বার রাক‘আত পড়ার ব্যাপারে হাদীসে বিদ্যমান আছে-
عن النبى صلى الله عليه وسلم ان قال ليلة النصف من شعبان اثنتى عشرة ركعة يقرأ فى كل ركعة فاتحة الكتاب وقل هوالله احد عشر مرات محيت سيأة وبرك له فى عمره-
অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রজনীতে (শবে বরাতে) ১২ রাক‘আত নফল নামায আদায় করবে, প্রতি রাক্‘আতে একবার সূরাতুল ফাতেহা আর দশবার সূরা ইখলাস পড়বে আল্লাহ তা‘আলা তার বিনিময়ে তাঁর জীবনের গুনাহ্ মাফ করে দেবেন এবং তাঁর জীবনে বরকত দান করবেন।
[নুজহাতুল মাজালেস: খণ্ড ১ম, পৃষ্ঠা ১৫৮]
তওরাত কিতাবে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি শা’বান মাসে এ কথা বলবে যে, আল্লাহ্ পাক ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। একমাত্র তাঁর বিধান একনিষ্ঠভাবে মেনে নিয়ে তাঁরই ইবাদত করছি যদিও কাফেররা এটা পছন্দ করে না, মহান আল্লাহ্ তাঁর আমল নামায় এক হাজার বছরের নফল ইবাদতের সওয়াব দেবেন। কবর হতে তিনি এমন অবস্থায় বের হবেন তাঁর চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মত হবে এবং আল্লাহর দরবারে সিদ্দিক হিসেবে তাঁর নাম লেখা থাকবে।
[প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা ১৫৯]
এ রাতে হায়াতুন্নবী তাজেদারে মদীনার উপর বেশী বেশী দরুদ পাঠ করার অধিক ফযিলত রয়েছে। কারণ কোন দোয়াই রসূলের উপর দরূদ শরীফ পাঠ করা ছাড়া কবুলের আশা করা যায় না। নিম্নোক্ত দরূদটি পাঠ করাই উত্তম-
اللهم صل على محمدن النبى الامى واله واصحابه وبارك وسلم-
উক্ত দরূদ পাঠ করার সাথে সাথে সালাম দেয়াও উত্তম কাজ। কারণ হায়াতুন্নবীর উসিলায় আমরা উক্ত বরাতের রজনী পেয়েছি। খালেস তথা বিশুদ্ধ অন্তরে তওবা করাও অন্যতম পুণ্য কাজ। হযরত ইমাম জাফর সাদেক এর মতে-
صلوة اليلة النصف من شعبان اربع ركعات تقرأء فى كل ركعة الحمد مرة وقل هو الله احد مائتين وخمسين مرةهم مجلس وتشهر وتدعو بعد التسليم – الخ-
অর্থাৎ শবে বরাতের নামায চার রাক‘আতে একবার সূরা ফাতেহা ও সূরা ইখলাস দুই শত পঞ্চাশ বার পড়ে বসে তাশাহুদ সালামের পর দোয়া করবে।
[সহীফায়ে ক্বাদেরীয়্যাহ্: পৃষ্ঠা ৩৯৩]
দুই রাক্আত করে বার রাক্আত নামায পড়তে হয়। প্রত্যেক রাক্আতে সূরা ফাতেহার পর ৩ বার ইখলাস (কূলহুয়াল্লাহু আহাদ) পড়ার মাধ্যমে নামায আদায় করা যায়। নিয়ত হল-
نويت ان اصلى الله تعالى ركعتى صلوة (ليلة البرأة) النفل متوجها الى جهة الكعبة الشريفة الله اكبر-
হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আমাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ত্রিশজন সাহাবী হাদীস বর্ণনা করেন যে, (নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন) যে ব্যক্তি এ নামায আদায় করবে এই রাতে আল্লাহ্ তা‘আলা তার প্রতি সত্তর বার (৭০) রহমতের দৃষ্টি দান করবেন। প্রত্যেক দৃষ্টিতে আল্লাহ্ তার সত্তরটি প্রয়োজন পূর্ণ করবেন এর মধ্যে সর্বনিম্নটি হল মাগফিরাত বা ক্ষমা করে দেয়া। [এহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন: ইমাম গায্যালী]
জামা‘আত সহকারে শবে বরাতের তথা নফল নামায আদায় প্রসঙ্গ
শবে বরাত তথা নফল নামায জামা‘আতসহকারে পড়া যাবে কিনা এ ব্যাপারে ওলামা ও ইমামদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। যেমন- হযরত গাউসুল আ‘যম দস্তগীর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
ان صلوة الخير مائة ركعة تؤدى بالجماعة ليلة النصف من شعبان وليلة القدر أيضا-
অর্থাৎ কল্যাণের জন্য নামায একশত রাক’আত জামাআত সহকারে আদায় করবে শবে বরা’আত তথা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিনগত রাতে এবং শবে কদরের মধ্যে।
[গুনিয়াতুত্ তালেবীন: পৃষ্ঠা ৩৬৫]
এ ব্যাপারে সহীহ বুখারী শরীফের তরজুমাতুল বাব-এ রয়েছে- باب الصلوة النافلة بالجماعة এবং উক্ত শিরোনাম অনুসারে হাদীস আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ইতবান বিন মালিক আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর দৃষ্টিতে অসুবিধা দেখা দিলে তিনি মসজিদে যেতে পারতেন না, তখন তিনি রসূল পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম দরবারে আরজ করলেন, আপনি যদি আমার ঘরে তাশরিফ এনে একটি স্থানে নামায আদায় করতেন, তাহলে সে স্থানে আমি আমার নামাযের স্থান হিসেবে বানাতাম। তখন জবাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, অনতিবিলম্বে তা করব। একদিন তিনি সিদ্দিক্বে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে আমার ঘরে তাশরীফ আনলেন, আমি তাঁকে বসতে অনুরোধ করলে তিনি না বসে বললেন, اين تحب أصلى من بيتك অর্থাৎ তুমি তোমার ঘরের কোন স্থানে আমি নামায পড়া পছন্দ কর? আমি তাঁকে আমার পছন্দনীয় স্থানে দেখিয়ে দিলাম। তখন তিনি দাঁড়ালেন অতঃপর তাকবীর দিলেন, আমরা তাঁর পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালাম এবং দুই রাকআত নামায (জামাতে) পড়লাম, তিনি সালাম ফেরালে আমরাও সালাম ফেরালাম।
(فكبر وصففنا ورائه فصلى ركعتين ثم سلم فسلمنا حين سلم(
রহুল বয়ান শরীফে আছে-
ان الصلوة النافلة بالجماعة خصوما صلوة الرغائب فى الليالى المباركة لاسا ليلة النصف من شعبان وليلة القدر من شهر رمضان مما يفعل به اولياء والصالحون-
অর্থাৎ নফল নামায জামাতসহকারে আদায় করা যায়। বিশেষ মুবারক রাতসমূহে নাফল নামায যেমন শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিনগত রাতে নামায রমজানে লায়লাতুল ক্বদরের নামায আল্লাহর ওলী ও সৎ বান্দারা জামাতের সাথে আদায় করেছেন।
উক্ত বর্ণনায় আরো এসেছে- وفيها توجد لاوة الطاعة অর্থাৎ এ রাতগুলোতে ইবাদতের তৃপ্তি পাওয়া যায়।
ইমামে আহলে সুন্নাত গাজীয়ে দ্বীন ও মিল্লাত ইমাম শেরে বাংলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিসহ প্রখ্যাত সুন্নী আলেমে দ্বীনগণ এসব হাদীসের আলোকে পবিত্র রাতগুলোতে নামায জামাআত সহকারে আদায় করাকে জায়েয বলেছেন, তবে ঘোষণার মাধ্যমে নয়। এ নামাযের জন্য বিশেষ আযান ও ইক্বামতও দেওয়া যাবে।
তদুপরি মি’রাজ রজনীতে জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর
ইকামতে নবী-রাসূলদের ইকতাদাতে মহানবীর (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ইমামতিতে দু’রাক্আত নামায বায়তুল মুক্বদ্দাস তথা মসজিদে আক্বসায় জামাআত সহকারে আদায় হয়েছিল।
সুতরাং এ সব ঘটনায় নফল নামায জামাআতের মাধ্যমে আদায়ের বৈধতা প্রমাণিত হয়।
ক্ষমার অযোগ্য বান্দারা
মহান আল্লাহ্ তা’আলা অগণিত গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, তবে কয়েক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা ক্ষমার অযোগ্য হয়ে যায়, তারা হল: মুশরিক, যাদুকর, ব্যভিচারী, সুদখোর, হিংসা-বিদ্বেষকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
তবে তারাও উপরিউক্ত কাজ আর করবে না বলে আল্লাহর দরবারে খালেস অন্তরে তওবা করলে তারাও মাফ পেতে পারে। কারণ- ان الله يغفر الذنوب جميعا انه هو الغفور الرحيم অর্থাৎ আল্লাহ্ সকল গুনাহ মাফ করবেন। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here