প্রতিবছর ৭০০কোটি টাকার কর ফাঁকি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গুলোর

0
103
শীর্ষ নিউজ, ঢাকা: বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে। ১৮টি দ্বি-পাক্ষিক ‘অপচুক্তি’র মাধ্যমে বিশ্বের ১৫টি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এদেশ থেকে এই টাকা নিয়ে যাচ্ছে।

শনিবার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে ‘দুর্বিনীত কর-আঘাত, অসমর্থিত বাজেট’ বিয়ষ আলোচনায় এমন তথ্য ও মতাতম উঠে আসে।

আলোচনাটি শুরু হয় একশনএইডের করা ‘অপচু্কুস্থিত’ নামের একটি প্রতিবেদনের  ফলাফল উপস্থাপনের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানে বলা হয়- মূলত রাজনৈতিক ও সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মত নিয়ন্ত্রণমূলক ‘অপচুক্তি’ করিয়ে এই আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পুনারায় বিনিয়োগের কথা থাকলেও কর্পোরেটরা লাভকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এদেশ থেকে মুনাফা নেয়ার পাশাপাশি ফাঁকি দেয়া করের টাকাও নিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রতিবেদন নিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কর্পোরেট ট্যাক্স এর মত প্রত্যক্ষ কর আদায়ে আমরা খুব বেশি চতুর ও দক্ষ হতে পারিনি। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আমাদের সুযোগ দিতে হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আমাদের যতটা কঠোর ও কৌশলী হওয়া উচিৎ ছিল, সেটা আমরা হতে পারিনি’।

অনুষ্ঠানে ‘অপচুক্তি’ নামের গবেষণা তুলে ধরেন একশনএইড বাংলাদেশের ডিরেক্টর আজগর আলী সাবরি। গবেষণার ফলফল বাংলাদেশে বাজেট, উন্নয়ন ও নীতিতে কি প্রভাব ফেলছে সেটিও তুলে  ধরা হয়।

গবেষণাটিতে ৫০০-রও বেশি আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ নিয়ে সমীক্ষা করা হয়। যেখানে দেখা যায়, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই সর্বোচ্ছ সংখ্যক ১৮টি অপচুক্তি আছে এবং বেশি কর ফাঁকি হচ্ছে। এই চুক্তিসমূহের একটি ধারার কারণে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের টাকার উপর করের লভ্যাংশ নিতেও বাংলাদেশের ক্ষমতা সীমিত হয়েছে। কর ফাকির এই টাকা দিয়ে প্রতিবছর ৩৪ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যেত বাংলাদেশে।

এ প্রসঙ্গে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতার অভাবে কর্পোরেটরা বেশি সুযোগ নিচ্ছে। আমরা বলছি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে সেটা করতে গিয়ে আমরা যদি তাদের কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ করে দেই, সেটা যৌক্তিক না। আমাদের গরিব মানুষের সুবিধা বাড়াতে হবে কর বাড়ানোর মধ্য দিয়ে’।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আশির দশকে আমাদের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ দরকার ছিল। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেকে আনতে হয়েছে। সেই সুযোগে তারা তাদের মত করে চুক্তি করেছে এদেশের নীতিনির্ধারকদের দিয়ে। আমাদের দেশে কর ফাঁকি দিয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এটা হতে পারে না। একটি বড় টেলিফোন প্রতিষ্ঠান মাত্র ৪৫০ জন লোক নিয়ে কাজ করছে। তারা আমাদের মানুষের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেনি। আমি যদি জামাই আদর না করি তবে সে আসবে না, এটা ভাবার সময় এখন আর নেই। এখন চুক্তিগুলো পূনঃমূল্যায়ন বা বাতিল করা উচিৎ’।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, ‘যে দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, সেদেশে যদি আমাদের বিনিয়োগ করা যেত তবে আমরা চুক্তির আলোকে আমরা কথা বলতে পারতাম। চুক্তি থেকে কিভাবে সুবিধা নিতে হবে সে বিষয়ে সচেতনতা দরকার। আমরা অনেক ক্ষেত্রে সচেতন ছিলাম না’।

বাংলাদেশ বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট এর প্রধান নির্বাহী ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের বিদেশী বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য ছিল দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেটি হয়নি। উল্টো টাকা নিয়ে যাচ্ছে। তাই বিদেশী বিনিয়োগ আমাদের প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান কিংবা দক্ষতা বৃদ্ধিতে কতটা কাজে আসছে? এই বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনতে হবে’।

কি করা যেতে পারে এ বিষয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘জাতিসংঘের বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যে নীতিমালা আছে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, সেটি যদি আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করা যায তবে ফাঁকির পরিমান কমিয়ে আনা যাবে। একটি আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে করতে হবে। সেটি না হলে অন্য দেশ সুযোগ বেশি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের নিয়ে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকলে এবং সবাই সেটি মানলে আমরা কর আদায় বেশি করতে পারব’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here