ফেসবুকে প্রতারণার ফাঁদ

0
151

পি নিউজ ডেস্ক

ইন্টারনেটভিত্তিক সাইবার জগৎ এখন অপরাধের আখড়া। এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই জগতে ঘটছে না। দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার থেকে শুরু করে যাবতীয় অপরাধ-প্রতারণার এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে পরিণত হয়েছে দেশের সাইবার জগৎ। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককেন্দ্রিক নানা অপরাধ-প্রতারণা ঘটে চলছে অহরহ। সামান্য অসাবধানতার কারণে এর ব্যবহারকারী প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ পড়ছেন মারাত্মক হয়রানিতে। সাইবার অপরাধীরা ৫০ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন আইডি খুলে এসব ভয়ঙ্কর সব অপরাধ অপকর্ম ঘটিয়ে চলছে। অথচ সন্দেহভাজন ব্লগার ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টধারীদের পুলিশ খুঁজে বের করতে পারছে না। এসব ব্লগার কখনো সংঘবদ্ধভাবে আবার কখনো বিচ্ছিন্নভাবে নিজস্ব ব্লগ পেজ খুলে নানারকম অপপ্রচারে লিপ্ত। তারা রাষ্ট্র, সরকার, মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে অশালীন ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কখনো কখনো ব্যক্তিবিশেষও তাদের ভয়ঙ্কর আক্রমণের শিকার হন। মিথ্যা, ভিত্তিহীন, মনগড়া, বিভ্রান্তিমূলক সব তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের মধ্যে গুজব রটিয়ে সরকারবিদ্বেষী করে তোলার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও তাদের কঠোর আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

সাইবার অপরাধীদের তত্পরতায় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্ট, ওয়েবসাইট, ই-মেইল ইত্যাদি বেদখল করে নিচ্ছেন হ্যাকাররা। ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে মাঝেমধ্যে। ঢাকার সৌদি দূতাবাসের একটি অভিযোগের বছর পেরিয়ে গেলেও অপরাধী শনাক্ত হয়নি। ওই ঘটনার তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর  পুলিশ, সিআইডি ও এসবি কর্মকর্তারা অপরাধী শনাক্তে ব্যর্থ হয়েছেন। ধূর্ত সাইবার অপরাধীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। গত অক্টোবর ও নভেম্বরে অনলাইন কার্যক্রমের ‘নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগে’ ব্র্যাক ব্যাংকের বেশ কয়েকজন গ্রাহকের হিসাব ‘হ্যাক’ (বেদখল) করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যঙ্গাত্মক ছবি প্রকাশের কারণে ২০১০ সালের ২৯ মে থেকে ফেসবুক এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

চাঁদাবাজিসহ হরেক অপরাধ : প্রেমের নামে গোপন অভিসারের ভিডিও কিংবা আপত্তিকর ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে কিংবা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মানমর্যাদার কথা বিবেচনা করেই আর আইনের আশ্রয় নেওয়া হয় না। আরেকটি পক্ষ ফেসবুকসহ অনলাইনে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে ব্যস্ত সব সময়। এমনকি খুনের জন্য পেশাদার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করার জন্য ই-মেইলের আশ্রয় নিচ্ছে। গোয়েন্দারা জানান, পেশাদার সন্ত্রাসীরা মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের খবর জেনে যায়। এ কারণে তারা এখন অপরাধ কর্মকাণ্ডের আগে ও পরে যোগাযোগ কৌশল পরিবর্তন করেছে। অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ই-মেইল ব্যবহার করছে। আবার বিভিন্ন ওয়েবসাইট এমনকি সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটও হ্যাক হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী। এখন পর্যন্ত ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার বিষয়ে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো অভিযোগের তথ্য নেই। কারণ এ বিষয়টি তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত হওয়ায় পুলিশও খুব বেশি বুঝে উঠতে পারছে না। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে এক গ্রুপ অপর গ্রুপকে সাইজ করতে তাদের নামেও ফেক আইডি করে হয়রানি করা হচ্ছে। আইডি হ্যাক করে টাকা পেলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় যার আইডি তার কাছে। দাবিকৃত টাকা না পেলে অশ্লীল ছবি আর কুরুচিপূর্ণ স্ট্যাটাস দিয়ে মানসম্মানের বারোটা বাজিয়ে দেয়। বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে আইডি ফিরিয়ে আনে অনেকে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি, ভিডিওসহ বিদ্বেষমূলক তথ্য ছড়ানো চললেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো পথ পাচ্ছে না টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিটিআরসি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ফেসবুক ও গুগল কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা না দিলে তারা ভুক্তভোগীদের জন্য আপাতত পরামর্শ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারছেন না। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, সামাজিক মিডিয়ার অপরাধ প্রতিরোধে আমাদের কোনো ফরেনসিক ল্যাব গড়ে উঠেনি। এ জন্য ফেসবুকে সংগঠিত বিভিন্ন অপরাধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি প্রযুক্তি সংক্রান্ত অপরাধের জন্য দেশে যে আইন আছে তাও বিশেষায়িত নয়। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে।

সন্দেহভাজন শতাধিক ব্লগ, হাজারো অ্যাকটিভিস্ট : ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ, বিটিআরসি ও বিভিন্ন সাইবার অপরাধের অভিযোগ তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বিভিন্ন গ্রুপের উদ্যোগে পরিচালিত ব্লগগুলো থেকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার-প্রচারণা চালানোর নজির রয়েছে। এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত শতাধিক ব্লগ রয়েছে এবং এসব ব্লগের অ্যাডমিন হিসেবে জড়িত রয়েছে সহস াধিক ব্যক্তি। এ ছাড়া ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা বাকস্বাধীনতার নামে বিশেষ কোনো মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজারের বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, সন্দেহভাজনদের মধ্যে অনেককেই ই-মেইলে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। ইতিপূর্বে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে কয়েকটি ঘটনায় দেশ-বিদেশে বেশ তোলপাড় হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধবসতিতে সন্ত্রাসী হামলা। ওই ঘটনার সূত্রপাত ফেসবুক থেকেই। এ ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দর্শনসহ বিভিন্ন রটনার মাধ্যমে এ দেশের ধর্মপ্রাণ সরল মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে জামায়াত-শিবির। ফেক আইডি দিয়ে ঝালকাঠির বেশ কিছু সাংবাদিক, আইনজীবীর নামে অশ্লীল ছবি সংযোজন করে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট করা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী স্থানীয় এক সাংবাদিক বাদী হয়ে সাইবার সন্ত্রাসী মনির সরদার ওরফে কোরিয়া মনির ও শিবির ক্যাডার আতিকুর রহমানকে আসামি করে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে পুলিশ ওই মামলাটি তদন্তে কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। ভুয়া ফেসবুক আইডি মৌমিতা সেন, বনলতা সেন, সজিব হাসানসহ কতিপয় ওয়েবসাইট ও এগুলোর পরিচালকদের বিরুদ্ধে কাপাসিয়া থানায় এজাহার দাখিল হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ন্যায়বিচার চেয়ে এই এজাহার দায়ের করেন কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ছানাউল্লাহ। এজাহারে বলা হয়, মো. ছানাউল্লাহ দীর্ঘদিন যাবত কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন। কিন্তু তার কর্মকাণ্ডে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি কুচক্রী মহল তার ক্ষতি করতে নানাভাবে অপতত্পরতা চালিয়ে আসছেন। বিগত দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কে বা কারা তার নামে ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ, নোংরা, আপত্তিকর, মহিলাদের নগ্ন ছবি, সম্মানহানিজনক ছবি, কলেজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক অসত্য তথ্যাবলি ইত্যাদি পোস্ট করে তাকে ও কলেজকে হেয় প্রতিপন্ন করেন। আইনে আছে : ভুয়া আইডির নামে ফেসবুক ও বিটিআরসি কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট ও অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। বিটিআরসির কাছে অভিযোগ জানানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভুয়া ও বাজে আইডি বন্ধ এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব অভিযোগ আমলেই নিচ্ছে না বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ। নির্দিষ্ট নম্বরে ফোনে লাইন পেলেও অভিযোগ লিখে রাখে ডেস্কের দায়িত্বরত ব্যক্তিটি। কিন্তু এই পর্যন্তই শেষ তাদের কাজ। বিটিআরসির জনদুর্ভোগ সংক্রান্ত এসব বিজ্ঞপ্তির সুফল জনগণ পায় না। এমপি-মন্ত্রীদের অভিযোগ পেলে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ পাত্তা পাচ্ছে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৯ (সংশোধিত)-এর ধারা (৫৭) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থার বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে তার এ কাজ হবে একটি অপরাধ। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে পরোয়ানা ছাড়াই অপরাধীকে গ্রেফতার এবং সাত থেকে ১৪ বছরের দণ্ড হতে পারে।-সাঈদুর রহমান রিমন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here