অজুর মাসায়েল ও ফজিলত

0
144

 

মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস আল-কাদেরী: অজু (وضوء) শব্দের আভিধানিক অর্থ সৌন্দর্য ( الحسن) পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা (النظافة) অজুর মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে অজুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন হয়। অপর দিকে অজুর কারণে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হতে গুনাহ ঝরে গিয়ে সেগুলো পাপমুক্ত হয়ে নূরানী উজ্জ্বল হয়ে যায়। শরিয়তের পরিভাষায় অজু হলোনির্দিষ্ট অঙ্গসমূহে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পানি প্রবাহিত করা।
[الفقه على المذاهب الاربعة পৃষ্ঠা ৪৬]

অজুর হুকুম
অজু মানে নাপাকী অপবিত্রতা দূর করা। ফলে অজুর মাধ্যমে ফরজ নফল যেমন নামায, তেলাওয়াতে সেজদা, শোকরের সেজদা, বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ ইত্যাদি আদায় করা যায়। সুতরাং উপরিউক্ত কাজ সমূহ আদায়ের জন্য অজু করা ফরজআবশ্যক। অতএব, কাজগুলো অজুবিহীন ব্যক্তির জন্য জায়েয নয়। অনুরূপ ক্বোরআন শরীফ স্পর্শ করার জন্য অজু ফরজ

অজুর শর্তসমূহ
অজুর শর্তসমূহ তিন ভাগে বিভক্ত। যথা:
. অজু ফরজ হওয়ার শর্ত।
. অজু শুদ্ধ হওয়ার শর্ত।
. অজু ফরজ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত।
অজু ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ
. অজুর শর্তের অন্যতম বালেগ হওয়া। নাবালেগ ছেলেমেয়ের জন্য অজু করা ফরজ নয়। তবে নাবালেগের অজু সহীহ হয়। তাই নাবালেগ বালেগ হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে অজু করে এরপর বালেগ হয় তাহলে তার অজু ভাঙ্গবে না। তার অজু বিদ্যমান থাকবে এবং সে অজু দ্বারা নামায পড়তে পারবে।
. নামাযের ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়া। অর্থাৎ ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব এশার নামাযের ওয়াক্ত হওয়া। যখন উপরিউক্ত ওয়াক্তগুলো হতে কোন একটি ওয়াক্ত আরম্ভ হয় তখন মুকাল্লাফ অর্থাৎ যার উপর নামায ফরজ হয়েছে তার উপর ফরজ উক্ত ওয়াক্তের নামায পড়া। যেহেতু নামায অজু ব্যতীত জায়েয নয়, তাহলে নামাযীর জন্য ফরজ, নামাযের জন্য অজু করা। তবে নামায আদায়ের জন্য যখন ওয়াক্তের প্রশস্ততা রয়েছেহয়তো প্রথম ওয়াক্তে আদায় করবে মধ্য ওয়াক্তে অথবা শেষ ওয়াক্তে আদায় করবে। আর যখন ওয়াক্ত একেবারে শেষ হয়ে যায় শুধু অজু করতে পারে এবং নামায পড়তে পারে এতটুকু সময় থাকে তখন সে ওয়াক্ত নামায অজুর জন্য নির্ধারিত হয়ে গেল। তখন বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ অজু করা নামায আদায় করা ফরজ। আজু নামায পড়তে তখন বিলম্ব করলে গুনাহগার হবে। আর যে ব্যক্তি ফরজ নামায পড়তে ইচ্ছা করে তার জন্য যেমন অজু করা ফরজ, অনুরূপ যে ব্যক্তি নফল নামায পড়তে ইচ্ছা করে, তার জন্যও অজু করা ফরজ। কেননা অজু ব্যতীত নামায পড়া হারাম।
. কেউ যদি জোহরের নামাযের জন্য অজু করে এবং সে অজু যদি না ভাঙ্গে এমতাবস্থায় আসরের ওয়াক্ত আরম্ভ হলে তার জন্য তখন অজু করা ফরজ নয়। কেননা ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়ার আগে অজু করা সহীহ।
. অজু করতে সক্ষম হওয়া। যে ব্যক্তি অজু করতে অক্ষম অর্থাৎ রোগের কারণে কিংবা অন্য কোন কারণে পানি ব্যবহার করতে অক্ষম তখন তার জন্য অজু করা ফরজ নয়। বরং সে তখন তায়াম্মুম করবে।
অজূ সহীহ হওয়ার শর্তসমূহ
. পানি পাকপবিত্র হওয়া। পানি পাক হওয়ার জন্য অজুকারীর ধারণায় পবিত্র হওয়া যথেষ্ট। আর পাকপবিত্র পানি হলো সে বৃষ্টি কিংবা নলকূপের পানিযার তিনটি গুণ হতে কোন গুণ পরিবর্তন হয়নি। পানির তিনটি গুন হলো রং, স্বাদ, গন্ধ।
. অজুকারী ভালমন্দ পার্থক্য করতে পারে এমন হওয়া। সুতরাং এমন নাবালেগ যে পার্থক্য করতে পারে নাতার অজু সহীহ হয় না।
. এমন কোন প্রতিবন্ধক পাওয়া না যাওয়াযা পানিকে সে অঙ্গে পৌঁছতে বাধা দেয় নাযে অঙ্গে পানি পৌঁছানো আবশ্যক। সুতরাং হাতে কিংবা চেহারায় কিংবা পায়ে এমন কোন জিনিস থাকে যা চামড়ার উপরে পানি পৌঁছতে বাধা দেয়। যেমন চেহারায় কিংবা হাতে কটন বা অন্য কোন জমাট টুকরা থাকে অথবা ঘড়ি বা আংটি থাকে, যে কারণে পানি না পৌঁছে।
. অজু করার সময় এমন কিছু সংঘটিত না হওয়া যা অজু ভেঙ্গে দেয়। যেমন চেহারা হাত ধোয়ার পর কারো বায়ূ বের হলতাহলে তার উপর প্রথম হতে আবার অজু শুরু করা। হ্যাঁ তবে কেউ ওজরওয়ালা বা অসুস্থ হলে প্রথম হতে অজু করতে হবে না। যেমন প্রস্রাবের ফোঁটা ফোঁটা সর্বদা বের হওয়ার রোগে কেউ যদি আক্রান্ত হয় এবং অজু করার সময় এক ফোঁটা অথবা কয়েক ফোঁটা বের হয় তাহলে তার জন্য ফরজ নয় প্রথম থেকে আবার অজু করা।
অজু ফরজ শুদ্ধ হওয়া (উভয়ের) শর্ত সমূহ
. জ্ঞানবান হওয়া। অতএব পাগল যদি অজু করে তার অজু সহীহ হবে না। এবং পাগলের জন্য অজু করাও ফরজ নয়।
. মহিলা হায়েজ নেফাসের রক্ত হতে পাক পবিত্র হওয়া। অতএব, হায়েজ নেফাস ওয়ালি মহিলার উপর অজু ফরজ নয়। এবং তাদের অজু সহীহ নয়। যদি হায়েজওয়ালি মহিলা অজু করে, এরপর হায়েজ থেকে মুক্ত হয় তবে তার অজু সহীহ না হওয়ায় গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ ওই সময়ে তার উপর অজু ফরজ হয়নি তার অজুও সহীহ হবে না।
. নিদ্রিত অমনোযোগী না হওয়া। কেননা নিদ্রিত ঘুমন্ত ব্যক্তি নিদ্রার সময় মুকাল্লফ থাকে না। অনুরূপ অমনোযোগী ব্যক্তি। তাদের জন্য অজু ফরজ নয় এবং তাদের অজু সহীহও নয়।
. মুসলমান হওয়া। অজু ফরজ হওয়ার জন্য মুসলমান হতে হবে। কেননা অমুসলমান অজু করার আদেশে আদিষ্ট নয়। তবে অমুসলমানের অজু সহীহ হবে। যখন সে অজু করে। কেননা আহনাফের মতে অজুর মধ্যে নিয়ত ফরজ নয়। নিয়তের উপর অজু নির্ভরশীল নয়। নিয়তের জন্য মুসলমান হওয়া শর্ত। অতএব, কাফের যদি নিয়ত বিহীন অজুর ফরজগুলো আদায় করে অজু সহীহ হবে। তবে কাফেরের তায়াম্মুম সহীহ হবে না। কেননা তায়াম্মুমের মধ্যে নিয়ত করা ফরজ

চলবে—-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here