নামাযে বার বার হাত উঠানো কতটুকু বৈধ? যা লা মাযহাবীরা করে (পর্ব ১)

0
157

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান:

রফ ইয়াদায়ন নিষিদ্ধ

মাসআলায় বিরুদ্ধবাদীদের আপত্তি এর খন্ডন
আপত্তি
ইমাম বোখারী ইমাম মুসলিম হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন
اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَذْ وَمَنْكِبَيْهِ اِذَا اِفْتَتَحَ الصَّلواةَ وَاِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوْعِ اِذَا رَفَعَ رَأْسَه مِنَ الرَّكُوْعِ رَفَعَهُمَا كَذلِكَ وَقَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ وَكَانَ لَايَفْعَلُ ذلِكَ فِى السُّجُوْدِ ـ
অর্থাৎ নিশ্চয় রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাত শরীফ দুকাঁধ শরীফ পর্যন্ত উঠাতেন যখন নামায শুরু করতেন এবং যখন রুকূ জন্য তাকবীর বলতেন, আর যখন রুকূথেকে শির মুবারক উঠাতেন, তখন। তেমনি দুহাত উঠাতেন এবং বলতেন, ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ্, রাব্বানা লাকাল হাম্দ।আর সাজদায় রফ ইয়াদায়ন করতেন না।
হাদীস শরীফ বোখারী মুসলিমের। এর সনদও অতিমাত্রায় সহীহ্ (বিশুদ্ধ) এটা দ্বারা রুকূ সময় রুকূ পর রফ ইয়াদায়ন (দুহাত উঠানো) প্রমাণিত হয়

খন্ডন (জবাব)
এর কয়েকটা জবাব দেওয়া যায়ঃ
এক. হাদীস শরীফে কথার উল্লেখ তো আছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম রুকূতে যাবার সময় রফ ইয়াদায়ন করতেন, কিন্তু একথার উল্লেখ নেই যে, শেষ সময় পর্যন্ত হুযূর আক্রামের আমল শরীফ বহাল ছিলো কিনা। আমরাও বলি যে, বাস্তবিকপক্ষে ইসলামে রফ ইয়াদায়ন প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো; কিন্তু পরবর্তীতে এটা মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে। বিরুদ্ধবাদীদের উত্থাপিত হাদীস শরীফে ওই মানসূখ (রহিত) কর্ম শরীফের উল্লেখ রয়েছে। আর এটামানসূখ হবার কথা আমিপ্রথম পরিচ্ছেদ’- বর্ণনা করেছি।
দুই. সাহাবা কেরাম রফ ইয়াদায়ন করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এর কারণও শুধু এটাই যে, তাঁদের দৃষ্টিতে রফ ইয়াদায়ন মান্সূখ। সুতরাংদারে ক্বুত্বনী ১১১ পৃষ্ঠায় সাইয়্যেদুনা আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস্ঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে
قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَ اَبِىْ بَكْرٍ وَمَعَ عُمَرَ فَلَمْ يَرْفَعُوْا اَيْدِيَهُمْ اِلاَّ عِنْدَ التَّكْبِىْرَةِ الْاُوْلى فِىْ اِفْتِتَاحِ الصَّلواةِ ـ
অর্থাৎ তিনি (হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস্ঊদ) বলেন, আমি হুযূর আক্রাম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব হযরত ওমর ফারূক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার সাথে নামায পড়েছি। তাঁরা নামাযের শুরুতেতাকবীর ঊলা’ (তাকবীর তাহ্রীমাহ্) ব্যতীত অন্য কোন সময়ে হাত তুলেন নি।
যদিরফ ইয়াদায়ন’-এর সুন্নাতটি বহাল থাকতো, তাহলে বুযুর্গগণ আমলটি কেন ছেড়ে দিয়েছেন? (বস্তুত আমলটি মান্সূখ বলেই তো তাঁরা পরবর্তীতে তা করেন নি।)
তিন. হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর। আর খোদ্ তাঁর আমল এর বিপরীত। কারণ, তিনি রফ ইয়াদায়ন করতেন না। যেমন আমি প্রথম পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। বস্তুত যখন বর্ণনাকারীর আমল (কর্ম) তার বর্ণনার বিপরীত হয়, তখন একথা বুঝা যাবে যে, হাদীস খোদ্ বর্ণনাকারীর মতেও মান্সূখ। তাছাড়া, আমি প্রথম পরিচ্ছেদে একথাও দেখিয়েছি যে, হযরত আলী মুরতাদ্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও রফ ইয়াদায়ন করতেন না। সাহাবীদের আমল হাদীসেরমান্সূখবা রহিত হওয়া প্রমাণ করেছে।
চার. ‘রিসালাহ আফতাব মুহাম্মদীতে আছে হাদীস হযরত ইবনে ওমর থেকে কয়েকটা সনদ বা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর সেটা অত্যন্ত দুর্বলও। কেননা, এক বর্ণনায়ইয়ূনুসআছেন; যিনি অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী। যেমনতাহযীবকিতাবে আছে। এর দ্বিতীয় সনদে আবূ ক্বিলাবাহ্ রয়েছে; লোকটি খারেজী মতবাদের ছিলো। দেখুনতাহযীব আর তৃতীয় সনদে রয়েছেআবদুল্লাহ, সে ছিলো কট্টর রাফেযী (শিয়া) চতুর্থ সনদে রয়েছে শোআয়ব ইবনে ইসহাক্ব। সেও মুর্জিয়া মতবাদের লোক ছিলো। মোটকথা, রফ ইয়াদায়নের পক্ষের হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের মধ্যে রাফেযীও রয়েছে। কেননা, এটা রাফেযীদের আমল। তারা রফ ইয়াদায়ন করে থাকে।
আপত্তি
বোখারী শরীফে হযরত নাফিথেকে বর্ণিত
اَنَّ اِبْنَ عُمَرَ كَانَ اِذَا دَخَلَ فِى الصَّلواةِ كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَاِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه رَفَعَ يَدَيْهِ وَاِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَرَفَعَ ذلِكَ اِبْنُ عُمَرَ اِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর যখন নামাযে প্রবেশ করতেন, তখন তাকবীর বলতেন এবং উভয় হাত উঠাতেন। আর যখনসামিআল্লাহুলিমান হামিদাহুবলতেন, তখনও উভয় হাত উঠাতেন। আবার যখন দুরাক্আত থেকে দাঁড়াতেন। তখনও উভয় হাত উঠাতেন। সর্বোপরি, তিনি কর্ম শরীফকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএর দিকে সম্পৃক্ত করতেন। (মারফূবলে সাব্যস্ত করতেন) দেখুন, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রুকূতে যাবার সময় রফ ইয়াদায়ন করতেন, কাজেই রফ ইয়াদায়ন সাহাবীগণের সুন্নাতও।
এর দুটি জবাব দেওয়া যায়ঃ
এক. হাদীস বিরুদ্ধবাদীদেরও বিপরীত। কারণ তে দুরাক্আত থেকে উঠার সময়ও রফ ইয়াদায়নের প্রমাণ মিলে। বিরুদ্ধবাদীরা শুধু রুকূ সময় রফ ইয়াদায়ন করে থাকে, দুরাক্আত থেকে ওঠার সময় করে না।
দুই. আমি প্রথম পরিচ্ছেদ হাদীস বর্ণনা করেছিহযরত মুজাহিদ বর্ণনা করেনআমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমরের পেছনে নামায পড়েছি। তিনি শুধু তাকবীর তাহ্রীমার সময় হাত উঠাতেন। সুতরাং এখন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমরের দুধরনের কর্ম বর্ণিত হয়েছেরুকূ সময় হাত উঠানো এবং না উঠানো। সুতরাং উভয় হাদীসের মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় যে, মান্সূখ হবার খবর পাবার পূর্বে তিনি হাত উঠাতেন, মানসূখ হবার খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি হাত উঠাতেন না। কেননা হাদীসে সময়ের উল্লেখ নেইকখন কোন্ সময় পর্যন্ত তিনি হাত উঠাতেন। সুতরাং উভয় হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে গেছে।
ত্বাহাভী শরীফে আছে
فَقَدْ يَجُوْزُ اَنْ يَّكُوْنَ اِبْنُ عُمَرَ فَعَلَ مَا رَاهُ طَاؤسٌ قَبْلَ اَنْ تَقُوْمَ الْحُجَّةُ عِنْدَه بِنُسْخِه وَتَرَكَه وَفَعَلَ مَا ذَكَرَه عَنْهُ مُجَاهِدٌ
এটাও হতে পারে যে, সাইয়্যেদুনা ইবনে ওমর রফ ইয়াদায়ন, যা ত্বাঊস দেখেছেন, মান্সূখ হবার প্রমাণ পাওয়ার পূর্বে করেছেন। অতঃপর যখন সাইয়্যেদুনা আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমরের নিকট রফ ইয়াদায়নের মান্সূখ হওয়া নিশ্চিত হয়ে গেলো, তখন তিনি তা ছেড়ে দিয়েছেন। আর তা করেছেন, যা হযরত মুজাহিদ দেখেছেন। (তিনি রফ ইয়াদায়ন করতেন না।)
মোটকথা, আমাদের মতে উভয় হাদীস শরীফ বিশুদ্ধ; তাও মর্মে যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আমল। কিন্তু ওহাবীলামাযহাবীদেরকে একটা হাদীস ছেড়ে দিতে হয়। বস্তুত কোন হাদীসকে ছেড়ে দেওয়া (অস্তিত্বকে মেনে না নেওয়া)’ চেয়ে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা উত্তম

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here