যে সব কারণে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে

0
119

পি নিউজ ডেস্ক: প্রতিদিনই দেশের মহাসড়কগুলোর কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। এমন কোনও দিন নেই সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ থাকে না গণমাধ্যমগুলোতে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় লেখা থাকে ‘ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক বা সেতু’, ‘ওভারটেকিং নিষেধ’সহ বিভিন্ন নির্দেশনা। তবুও সংবাদকর্মীদের প্রায় সময়েই গুনতে হয় আগের দিনের তুলনায় পরের দিনে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কমলো বা বাড়লো কিনা। ঈদের সময়েও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঈদের আগে ছিল যানজট, পরের তিনদিন রাস্তা প্রায় ফাঁকা। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রতিদিনই। শুধু কোরবানির ঈদের দিন থেকে পরের চারদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে মোট ৫৫ জনের। আহতের সংখ্যা শতাধিক।

মহাসড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ কি? এই প্রশ্নটির উত্তরে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের দাবি, চালকের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনাই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে শুধু এই কারণেই শতকরা ৯১ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এছাড়াও মহাসড়কে দুর্ঘটনার আরও ছয়টি বড় কারণ চিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের ওই পর্যবেক্ষণে বাকি কারণগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে চালকের অদক্ষতা, মোবাইল ফোনে কথা বলা, খেয়ালিপনা, ফাঁকা রাস্তা পেয়ে প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালনা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, ফুটপাত দখল, ওভার টেকিং, রাস্তার নির্মাণ ত্রুটি, গাড়ির ত্রুটি, যাত্রীদের অসতর্কতা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা ও না মানা, নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করা,ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ঈদের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ও রাস্তায় ওভারটেক করার তীব্র মানসিকতা। আর এসব কারণেই ঈদের মতো প্রধান উৎসবগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ গ্রামের পথে আসা-যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়।

এবারের কোরবানির ঈদের ছুটিতে সড়কগুলোতে যেন মৃত্যুর মিছিল লেগেছিল। ঈদের দিন থেকে পরবর্তী চারদিনের ছুটিতে (১৩-১৬ সেপ্টেম্বর) সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছেন ৫৫ জন, আর আহত হয়েছেন ১২৭ জন। কোরবানি ঈদের আগের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর নিহত হন ৪ জন ও আহত হন ১৭ জন। ঈদের দিন নিহত হন ১১ জন, আহত হন ৫৪ জন। ঈদের পরের দিন ১৫ সেপ্টেম্বর নিহত হয়েছেন ২২ জন, আর আহত হন ৮ জন। গতকাল ১৬ সেপ্টেম্বর নিহত হন ১৮ জন, আর আহত হন ৪৮ জন।

এসব দুর্ঘটনায় কারও শাস্তি হয় না, বেশির ভাগ দুর্ঘটনার পর মামলা হয় না। আর মামলা হলেও তার কোনও বিচার হয় না, হয়না সুরাহা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার কোনও সংস্কৃতি যদি এদেশে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে তা পরিবহন খাতে। এ কারণে মহামারির মতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনা।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ৮ জন। চিকিৎসাধীন আছেন আরও দুই জন। হতাহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলী আরশাদ জানিয়েছেন, শশই এলাকায় ঢাকা-সিলেট পথে চলাচলকারী এনা পরিবহনের বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের ৭ জন এবং হাসপাতালে আনার পর মারা যান আরও একজন।

অপরদিকে, আজ ১৭ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন এবং কালিহাতীতে প্রাইভেট কারের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেলে থাকা দুই আরোহী নিহত হয়। মির্জাপুরের সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০।

পুলিশ জানিয়েছে, কুড়িগ্রাম থেকে যাত্রীবাহী বাসটি ঢাকায় আসছিল, আর বিপরীত দিক থেকে ইটবোঝাই একটি ট্রাক যাচ্ছিল টাঙ্গাইলের দিকে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ি দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় সকাল সোয়া সাতটার দিকে। ঘটনাস্থলেই এক নারী ও শিশু এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও একজন নিহত হন। পরে আরও দুজন মারা যান চিকিৎসাধীন অবস্থায়।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে গাড়ি চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালালে তাদের জরিমানার ব্যবস্থা করা, মামলাগুলো ত্বরান্বিত করার কথা বলেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন। ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘ঈদের সময়ে মহাসড়কের কোথাও কোথাও জ্যামের সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত গাড়ির চাহিদার কারণে। আর এই জ্যামের জায়গাটুকু পার হয়ে খালি রাস্তা পেয়ে তারা হাই স্পিডে  গাড়ি চালান, জ্যামে পার হওয়া সময়টুকু পুষিয়ে নেওয়ার জন্য। তারা ওভার স্পিডে ওভারটেক করতে যান সামনের গাড়িগুলোকে। এভাবেই ঈদের সময়ের ফাঁকা রাস্তায় দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। ’

ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো, এসময়ে তারা (গাড়িচালক) যতো বেশি ট্রিপ দিতে পারবে, ততো বেশি টাকা আয়ের একটি বিষয় জড়িত থাকে। সাধারণভাবে যদি দিনে তারা ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান তো ঈদের সময়ে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টাও গাড়ি চালানোর রেকর্ড রয়েছে। আর অতিরিক্ত এ ট্রিপ দেওয়াতেও তাদের ভুল করার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে।’

সড়ক দুর্ঘটনারোধে মহাসড়কগুলোতে গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেখানে তা রেকর্ড হয়ে থাকে। সেখানে যদি মোটা অংকের জরিমানা করার বিধান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তাহলে চালকরা সচেতন হবে ।’ এভাবে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা গেলে দুর্ঘটনা যথেষ্ট কমানো সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘যে লোক একবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেবেন, তিনি পরের বার এবিষয়ে নিশ্চিতভাবেই চিন্তা করবেন। তাই সরকারের উচিত গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মহাসড়কগুলোতে ইমপ্লিমেন্ট করা। এ কাজে যদি ৫০০ কোটি কিংবা হাজার কোটি টাকাও লাগে, তাহলেও তাতে পিছু হটলে চলবে না।’

বছরে সারাদেশে এক  লাখ নতুন গাড়িচালক যুক্ত হচ্ছে। এই এক লাখ চালকের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে ১০০টি প্রশিক্ষণ স্কুল প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় সেই স্কুল প্রশ্ন করেন ড. মোয়াজ্জেম হোসেন।

অপরদিকে, ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করে সড়ক দুর্ঘটনাকে এক বিরাট অরাজকতা উল্লেখ করেছেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যপক ড.মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার। তিনি বলেন, ‘ডিস্ট্রিক্ট রোড সেফটি কাউন্সিল এবং ন্যাশনাল রোড সেফটি কাউন্সিলের সড়ক দুর্ঘটনারোধে বড় ভূমিকা রাখার কথা। অথচ বছরের পর বছর ধরে আমরা কথা বলে যাচ্ছি, কিন্তু তাদের কোনও মিটিং নেই, জবাবদিহিতা নেই। সরকারের বড় লোকেরা কেবল কথাই বলে যাচ্ছে। বাস্তবে তার কোনও প্রয়োগ নেই। চালকরা কেউ নিয়ম মানেন না, মানানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগও নেই কোথাও। যার কারণে প্রতিবছর ঈদের সময়টাতে আমরা কতো শত মৃত্যু দেখতে বাধ্য হই বলেন ড. মাহবুব।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে ফোন করে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন কথা বলতে পারবো না।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here