ধর্ম যার উৎসব তার: দুর্গোৎসবকে সার্বজনীনতায় রূপ দেয়ার নেপথ্য কথা (পর্ব: ০২)

0
176

আবছার তৈয়বী ::
এ বছর বাংলাদেশে প্রায় একই সময়ে দুই ধর্মের দু’টি ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়। একটি মুসলমানদের- হিজরী নববর্ষ উদযাপন, শোহাদায়ে কারবালার স্মরণ ও ১০ মহররমের আশুরা। অপরটি হিন্দুদের- দুর্গোৎসব। উভয় ধর্মসম্প্রদায় নিজ নিজ অনুষ্ঠান একাগ্রতার সাথে পালন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়ার দিকে দেখলে আপনি বুঝতেই পারবেন না যে, বাংলাদেশে আদৌ মুসলমানদের কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে কি-না? অথচ বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা ৯২%+ আর হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৬%। যদি গণতন্ত্র মানেন- তো মুসলমানদের কথা মিডিয়ায় বেশি আসার কথা। কিন্তু হচ্ছে- উল্টোটা। এর জন্য দায়ী কে? আপনি কাকে দায়ী করবেন- তা আমি জানি না। তবে আমি আমার নিজেকেই দায়ী করবো। কারণ, আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি না। কাজীর গরুর মতো মুসলমান কেতাবেই (নামেই) আছে, কিন্তু গোয়ালে (দীনি কাজে) নেই।

একটি বিষয় আগেই পরিস্কার করে নেয়া ভালো যে, আমার এই সিরিজের লেখাগুলো হিন্দু বা কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। নয় সরকার বা কোন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেও। বরং আমার এই লেখাটি বাংলাদেশের অচেতন মুসলমানদের সচেতন করার উদ্দেশ্যেই লিখিত। মুসলমানরা সচেতন হলে আমার এই কষ্টটা সার্থক হবে, না হয় সব কষ্ট জলেই যাবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন “ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ অথবা ‘দুর্গোৎসব শুধু হিন্দুদের নয়, বরং সার্বজনীন” এমন ঈমান বিধ্বংসী কথা বলা হলো, তখন এর পরপরই একটি ‘চমৎকার’ বিবৃতি দিয়েছেন- হেফাজত আমীর মাও. শফী সাহেব। আমাদেরও আমীর আছেন, ইমাম আছেন, খতিব আছেন, আলেম আছেন, নেতা আছেন। সাদা, গোলাপী, লাল, নীল, পাঁচকল্লি ও কিসতিওয়ালা চেকনাই চেহারার পীর সাহেব ও গর্দানমোটা গদ্দিনসীন আছেন। আছেন মিঠে ও কড়া গরু খাওয়া অগণিত সুন্নী। কিন্তু কোন বিবৃতিও নাই, প্রতিবাদও নাই এবং সচেতনতাও নাই। তাহলে তারা কোথায় আছেন? আছেন রে ভাই আছেন। কেউ আছেন ঘুমে, কেউ আছেন ফটোসেশনে আর কেউ আছেন মুরিদের অর্ঘ্য নিতে ব্যস্ত। ইসলাম নিয়ে যে যেভাবে ইচ্ছা খেলুক- তাদের কী? তারা উচ্চবাচ্য করলে যদি ‘দুর্গাদেবী’ নারাজ হয়? তাই তারা নিরাপদ দূরত্বে মুখে মাসকিন টেপ লাগিয়ে লুকিয়ে আছেন। দুই ঠোঁট নেড়ে একটি শব্দ বের করার হিম্মতও তাদের নেই। ছি! সে হিসেবে শফী সাহেব এই বয়সেও তাদের থেকে কমসে কম ‘১০ ডাং’ এগিয়ে আছেন। আপনি তাকে ‘ওহাবী’ বলে যতো গালিই দেন- বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনিই কিন্তু হিরো! আর বার্নিং ইস্যুতে যথা সময়ে যথাযথ ভাবে কথা বলতে না পারায় ‘সাত বস্তা ইলম’ ও ‘আট বস্তা আমল’ অগণিত মুরিদীন, মুহিব্বীন ও মোতায়াল্লেকীন নিয়েও আপনি- জিরো। জিরো মানে- ঘোড়ার ডিম।

বলছিলাম- দুর্গোৎসবের কথা। আপনি পূজা-মণ্ডপে গিয়ে দেখুন- সেখানে কতজন হিন্দু আছে আর কতজন মুসলিমের ছেলে-মেয়ে? দুর্গাপ্রতিমা আর জিন্দা দুর্গাদেবীদের সামনে নিয়ে কত কিসিমের রঙ ঢং করছে- আপনি নিজ চোখেই একবার দেখে আসুন। দেখুন- মুসলমানের ছেলে-মেয়েরা সমানেই গিলছে- দুর্গাদেবীর প্রসাদ আর গলাধঃকরণ করছে লাল-নীল জল, ডিস্টিল ওয়াটারের মতো সামান্য হোমিও ওষুধের গন্ধযুক্ত স্বচ্ছ পানি আর গ্রামাঞ্চল হলে বাসি পান্তাভাতের রস! দেখুন- কী হারে মডর মডর করে চিবুচ্ছে- পূজোর নারিকেল। পূজোর সুস্বাদু প্রসাদের নাম ‘পঞ্চগব্য’। সেই পঞ্চগব্য তৈরী হয় গোমাতার পেছনের দিকে নিঃসৃত কিছু জিনিস দিয়ে- দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য- দই ও ঘি, আরেকটু পেছনের জিনিস, কী যেন নাম তার- গোবর এবং বর্ণিল গোমূত্র দিয়ে। ওফ্ খেতে কত মজা- তাই না? ওহে মুসলমান ছেলে! খাও বাছা খাও, পেট ভরে খাও। স্বাস্থ্য বাড়াও, মস্তি করো আর পুণ্য লাভ করো!

14502782_10209303696002707_7141579675317869112_n

মিডিয়ার কল্যাণে আপনারা শুনে থাকবেন- দেবী দুর্গা একেক সময় একেকরূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসে। কয়েক বছর আগে একবার শুনেছিলাম ‘দেবী দুর্গা’ নাকি সেবার নৌকায় করে এসেছিল- তাই ‘বাংলাদেশে ধানের ফলন বেশি হয়েছে’! আসতাগফিরুল্লাহ! এই কথাটি যদি কোন হিন্দু পুরোহিত বলতেন, তাহলে কোন কথা ছিলো না। কারণ, হিন্দুদের ধর্মমতে- সে রকম বলাই যায়। কিন্তু হিন্দু পুরোহিতের মুখে সে কথাটি আমি শুনিনি, শুনেছি- মুসলমান নেতার মুখে! বাংলাদেশে যার কোটি কোটি ফলোয়ার আছে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা কী জানেন? দুর্গার যে কার্যকারিতার কথা প্রচার করা হয়, তা হিন্দুধর্মের বইগুলোতে কোথাও লেখা নেই। বিশ্বাস না হলে নিম্মের স্লোক ক’টি একবার পড়ুন।
“প্রথমং শৈলী পুত্রীতি, দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী।
তৃতীয়ং চন্দ্রঘণ্টেতি, কুষ্মাণ্ডেতি চতুর্থকম্
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা।
সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি অষ্টামম্
নবমং সিদ্ধিদাত্রীতি নবদুর্গাং প্রকীর্তিতার।
উক্তান্যেতানি নামানি ব্রহ্মনৈব মহাত্মনা।

হিন্দু ধর্মমতে- দেবী দুর্গার নয়টি রূপ। সেগুলো হল- শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কূষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী, সিদ্ধিদাত্রী। হিন্দু ধর্মমতেই এই নয় রূপ ছাড়া দেবী দুর্গার আর কোন রূপ নেই। দেবী দূর্গা কিসে চড়ে আসলে কী হবে- ধান হবে নাকি গম হবে, বন্যা হবে নাকি খরা হবে, ঝড় হবে নাকি তুফান হবে- ইত্যাদি যে সব কথা প্রচার করা হয়, তা কোথাও লেখা নেই এবং তা শাস্ত্র মতেই ভুটভাট! হিন্দুরা তাদের ‘মা’ দেবী দুর্গাকে যেভাবে ইচ্ছা গুণারোপ করুক, যে মণ্ডপে যেভাবে ইচ্ছা সাজাক- তাতে কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু মুসলমানদের জন্য এসব কথা বলা, প্রচার করা ও বিশ্বাস করা সরাসরি কুফরি। হিন্দুরা তাদের দেবীর যেভাবে ইচ্ছা, যতো ইচ্ছা গুণকীর্তন করতে চায় করুক, কিন্তু মুসলমানরা কেন এসব কুফরি কথা বলবে? বিশেষ করে দেশের নেতৃস্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের মুখে এসব কথা শুনে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ ও চেতনাহীন মুসলমানরা এসব কথা বিশ্বাস করতে শুরু করে। এসব বলার উদ্দেশ্যটাই হলো- জনগণকে দুর্গোৎসবের প্রতি আকৃষ্ট করা। মানে দুর্গাপূজাকে সার্বজনীনতায় রূপ দেয়া। মুসলমানদের উচিত দুর্গোৎসব বা অন্য পূজোয় যোগ দেয়ার আগে আল্লাহর রাসূলের (দরুদ) ভবিষ্যতবাণীর প্রতি নজর দেয়া। হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছন- “শীঘ্রই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা করবে। আর খুব শীঘ্রই আমার উম্মতের কিছু লোক মুশরিকদের সাথে যোগ দিবে”। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩৯৫২)। আল্লাহ আমাদের ঈমান, আকীদা ও আমল হেফাজত করুন। আমীন। বিহুরমাতি রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাহবিহী ওয়া সাল্লামা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here