ধর্ম যার উৎসব তার: কানা মিডিয়া ও ফানা সুন্নী (পর্ব: ০৩)

0
134

আবছার তৈয়বী:

গতকাল বাংলাদেশের সর্বত্রই পবিত্র আশুরা ও শাহাদাতে ইমাম হোসাইন (আলাইহিস সালাম ওয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু) স্মরণ অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানগুলি পালন করেছে বাংলাদেশের সুন্নী সমাজ এবং শিয়া সম্প্রদায়। ওহাবী, কওমী, হেফাজতী, মওদূদী, সালাফী ও আহলে হাদিস সম্প্রদায় এই সব অনুষ্ঠান পালন থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। তাদের হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা এবং প্রতিষ্ঠানে কোথাও এই মহান ইমামের শানে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি। উল্টো তারা সুযোগ পেলে ইমামুল আকবর সায়্যিদী ওয়া মাওলায়ী হযরত ইমাম হোসাইন (আলাইহিস সালাম ওয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু) কে ‘বিদ্রোহী’ অপবাদ দিয়ে ঘৃণ্য মলঊন ইয়াজিদ বন্দনায় মেতে উঠে। তার মানে কী? তার মানে- তারা ইয়াজিদী। তারা সবাই মিলে ইমাম হোসাইন (আ. ও রা.) শিয়া সম্প্রদায়কে দিয়ে দিয়েছে। আর শিয়ারাও এই দিবসকে কেন্দ্র করে যাচ্ছে-তাই করেছে। এই দিবসে তাদের প্রধান আয়োজন হলো- ‘তাজিয়া মিছিল’। ঢাকাতে ফি বছর হোসনী দালানকে কেন্দ্র করে এই তাজিয়া মিছিল হয়। এ বছর দেখলাম- রেকর্ড সংখ্যক শিয়া মহিলাও যোগদান করেছে। ঘোড়াকে সাজিয়ে, ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের নকল কবর বানিয়ে, মূর্তি-মুখোশ কাঁধে নিয়ে, লোক দেখানো বুক ও মাথা চাপড়িয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, তারা হোসাইনের (আ. ও রা.) প্রেমিক! কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, তাদের আদর্শিক পূর্বপূরুষরাই ইমাম হোসাইন (আ. ও রা.) কে শহীদ করেছে এবং শাহাদাত পরবর্তীতে কূফায় মাতম করেছে ও মায়াকান্না দেখিয়েছে। তাদের মাতম ও মায়াকান্না দেখে নবী বাগানের প্রোজ্জল ফুল সায়্যিদা যায়নাব (আলাইহাস সালাম ওয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহা) তাদের ওপর রুষ্ট হয়েছেন এবং বদদোয়া করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত শিয়াদের এই লোক দেখানো মায়াকান্না যেমন বন্ধ হবে না, তেমনি কারবালা তথা ইরাকেও ইমাম হোসাইনের (আ. ও রা.) রক্তের অভিশাপ কোনদিন বন্ধ হবার নয়। সমরে ও শান্তিতে শিয়াদের রক্ত ঝরতেই থাকবে- এটিই খোদার ফায়সালা!

কথা সেটি নয়। কথা হলো- বাংলাদেশের মিডিয়া কভারেজ নিয়ে। আজ বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল দেখলাম। সব চ্যানেলেই ১০ মুহাররম ও আশুরা বলতে ওই ‘তাজিয়া মিছিল’কেই দেখানো হয়েছে। সম্পূর্ণ অনৈসলামিক এই কাজটিকে ইমাম হোসাইনের (আ. ও রা.) স্মরণের নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কোথাও সুন্নীদের কোন প্রোগ্রামের খবর নেই। ভাবতে পারেন! দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলো আজ প্রকাশিত হয়নি। কাল প্রকাশিত হলে দেখবেন- আর কিছু থাক বা না থাক, তাজিয়া মিছিলটি থাকছেই। আজ প্রকাশিত বহুল প্রচারিত অনলাইন পত্রিকাগুলোতেও একই অবস্থা। তারাও আশুরা বলতে তাজিয়া মিছিলটিকে বুঝিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের প্রতিটি সুন্নী ঘরে আশুরা ও কারবালার স্মরণে অনুষ্ঠান হয়েছে। বাংলার সুন্নী নারী-পূরুষ রোজা পালন করেছেন। দেশের প্রতিটি সুন্নী মসজিদে মিলাদ মাহফিল হয়েছে। দেশের প্রতিটি সুন্নী দরবারে আলোচনা সভা হয়েছে। দেশের নানা স্থানে যুগ যুগ ধরে বিশাল বিশাল সমাবেশ হয়েছে- ১ দিন, ৩দিন, ৫দিন এবং ১০ দিনব্যাপী। কিন্তু হায়, কানা মিডিয়ার চোখ সেদিকে পড়লো না। একটি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়ও সে খবর আসলো না। কেন আসলো না? কারণ মিডিয়ায় সুন্নীদের কথা ভাবার মতো কোন লোক নেই। সরকার ও প্রশাসনে সুন্নীদের পক্ষে কথা বলার কেউই নেই। এভাবে আর কতদিন চলবে- তা আল্লাহ-রাসূলই (দরুদ) ভালো জানেন।

গত পরশু বাংলাদেশে আরো একটি অনুষ্ঠান হয়েছে। সে অনুষ্ঠান হিন্দুদের ‘দুর্গাপুজা’। মিডিয়ার কল্যাণে এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের বদান্যতায় সে অনুষ্ঠান এখন ‘শারদীয় উৎসব’ ও ‘দুর্গোৎসব’ হিসেবে জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। দুর্গা বন্দনায় নেতা-নেত্রীদের বাণী এসেছে। গতকালের সকল মিডিয়ার লীড নিউজ ছিলো- সে শারদীয় উৎসবের খবর। প্রতিঘন্টার নিউজে সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে সেটি দেখানো হয়েছে এবং দেশের সকল পত্রিকায় দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের খবরটি কমসে কম চার কলামব্যাপী সচিত্র প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নিউজের সাথে যোগ হয়েছে দুর্গার নানা মহত্ত্ব বয়ান। সেই বয়ান ভাষার লালিত্যে এতোটা সুষমামণ্ডিত যে, পাঠকমাত্রই দুর্গাপ্রেমে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। হিন্দু সম্প্রদায় নিজেদের হাতেগড়া প্রতিমাগুলো নিজেরাই চোখের জলে বিসর্জন দিয়েছে- তাতে আমাদের ভারাক্রান্ত হবার কোন কারণ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বাজেট করা অনুদান শেষ পর্যন্ত যে জলেই গেল- সেটা নিয়েও আমাদের ভাবার কি অবকাশ আছে? যদিও সরকারের প্রদত্ত ওই টাকাগুলোর প্রায় সবটাই মুসলমানের টাকা।

তাহলে দাঁড়ালোটা কী? মুসলমানের টাকায় প্রতিমা বিসর্জন নয় তো? রাস্ট্রযন্ত্রের সব কল-কব্জাগুলো যেহেতু ‘সার্বজনীন উৎসবে’ মেতেছে, সেহেতু সামান্য ক’টা টাকা জলে গেলেই বা আর এমন ক্ষতি কি? উৎসব তো! উৎসবে দু’হাতে টাকা ওড়ানো বাঙালিদের বদ অভ্যাস। কিন্তু সে উৎসবটা যদি ‘সার্বজনীন’ হয়- তাহলে টাকা জলে গেলেও চিন্তা কিসের? সেই ক’টা টাকা যে কতো কোটি টাকা- তার হিসাব আমি দেবো না। তবে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার নিশ্চয়ই এ দাবি করার অধিকার থাকার কথা যে, মুসলমানদের প্রতিটি অনুষ্ঠান- সেটা শাহাদাতে কারবালা বলুন বা ১০ ই মুহররম বলুন, কিংবা ঈদে মিলাদুন্নবী (দরুদ) বলুন অথবা ঈদ অনুষ্ঠান বলুন- সবখানে সরকারের আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু এই দাবিটি আমি একলা করলেই তো হবে না। এই দাবিটি করতে হবে বাংলাদেশের সকল মুসলমানকে। মনে রাখতে হবে যে, এটা কোন অন্যায্য দাবি বা অন্যায় আবদার নয়; বরং গণতন্ত্র বলুন বা সমাজতন্ত্র, যেটাই মানুন- সকল ধর্মসম্প্রদায়কে সমান চোখে দেখতে হবে। না হয় গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হবে না, সমাজতন্ত্রও না এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাও না। এক সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে অনুদান দিলে এবং অন্য সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে অনুদান না দিলে- সেটাকে বলা হয় ‘কানানীতি’। এই ‘কানানীতি’ জুলুমের পর্যায়ে পড়ে। এতে করে বাংলাদেশে ন্যায়, সমতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই বিষয়টি সবার আগে বুঝতে হবে- যারা দেশ চালায়, তাদেরকে। এই ব্যাপারটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে- যারা মিডিয়া চালায়, তাদেরকে। কিন্তু তাদেরকে বুঝানোর উদ্যোগ বা দায়িত্বটি কে নেবে- তা কি বলতে পারেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here