“মূলত ছয় দফাই বাঙালি জাতির মুক্তির মূলমন্ত্র”

0
270

আজাদ জামাল:

আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন। ৭ জুনের ছয়দফা গবেষণার বিষয়, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তির সংগ্রাম।একটি সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা,যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন এই স্বাধীনতাকে ১৯৪৭ সালের ভারত পাকিস্তান বিভক্তির পর থেকে বঙ্গবন্ধু ধারাবাহিক ভাবে ধীরে ধীরে প্রথমত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং পরে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে নিয়ে আসার একক কৃতিত্ব কেবল বঙ্গবন্ধুর। অবশ্যই এখানে আপামর বাঙালি এবং ছাত্রজনতার অবদান ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।এই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র নিহিত ছিল এই ছয়দফাতে, আসুন দেখি ছয়দফা কি।

ছয় দফা: বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ

৭ জুন বাংলাদেশ ঐতিহাসিক ‘৬ দফা দিবস’ পালন করে। ১৯৬৬ সালের এ-দিন ছয় দফার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি পুলিশ ও ইপিআর-এর গুলিতে ১১ জন শহীদ হন।

৬ দফা-কে বিবেচনা করা হয় বাঙালি জাতির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বা মুক্তির সনদ।
কী ছিল ছয়দফায়?
আসুন দেখে নেই-

‘প্রস্তাব – ১ :
শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:

দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারনের সরাসরি ভোটে।

প্রস্তাব – ২ :
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:

কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল মাত্র দু’টি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে- যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।

প্রস্তাব – ৩ :
মুদ্রা বা অর্থ-সমন্ধীয় ক্ষমতা:

মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দু’টির যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারেঃ-

(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দু’টি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।

অথবা

(খ)বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল মাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

প্রস্তাব – ৪ :
রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা:

ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

প্রস্তাব – ৫ :
বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:

(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।

(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে।

(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।

(ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোন রকম বাধা-নিষেধ থাকবে না।

(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

প্রস্তাব – ৬ :
আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা:

আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।’

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলির সম্মেলনের প্রথমদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা দাবি পেশ করলে পাকিস্তানি সরকার ও মিডিয়া বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিত্রিত করে। ফলে তিনি দ্বিতীয় দিন সম্মেলন বর্জন করেন এবং ১১ ফেব্রুয়ারি,১৯৬৬ দেশে ফিরে আসেন। শুরু হয় ৬ দফার দাবিতে তীব্র আন্দোলন।

লেখক: ব্যাংকার, সংগঠক ও সমাজসেবক