ইসলামে সাধনার স্বাদ (১)

0
83
ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী:
সিন্দু হতে স্পেন আজকের ২৬ টি পূর্ণ রাষ্ট্র এবং ১০ রাষ্ট্রের অংশ নিয়ে গঠিত বিশাল একটি সম্রাজ্যের নাম আব্বাসীয় খিলাফত। সম্রাজ্য যেমন বিশাল জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায়ও ছিলো সেরা। শাসকগণ ছিলেন বিদগ্ধ পণ্ডিত। ইউরোপের জন্য ছিলো তখন মধ্যযুগ (অন্ধকার যুগ)। আমেরিকার নামক রাষ্ট্রটি আবিস্কার হয় তার সাড়ে ৬ শত বছর পর।
আব্বাসীয় শাসকের তারকা শাসক খলিফা মাহদীর পক্ষে রাজ কর্মকর্তা মদিনায় ঈমাম মালেক (র.)’র দরবারে গিয়ে দুই রাজপুত্র মুসা ও হারুনকে হাদিস শিক্ষার আমন্ত্রণ জানান। ঈমাম এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে খলিফা মাহদী তার কারণ জানতে চান। ঈমাম বললেন, ‘এই ইলম খুবই সম্মানিত ধন। অর্জনে সাধনা প্রয়োজন। এই ধন রাজ দরবারে যায় না, ডুবুরির মত রাজপুত্রকেও করতে হয় আহরণ’। এ কথা শুনে খলিফা দুই সন্তানকে ঈমামের দরবারে সোহবত সাধনার জন্য অর্পন করেন। সাধনায় একদিন হারুন শুধু জগৎ বিখ্যাত শাসক হননি, দুনিয়ার সেরা জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণাগার ‘বাইতুল হিকমা’ মালিকও হন।
ঈমাম আবু হানিফা (রহ.)’র সেরা শিল্প যাঁকে শুধু শিক্ষা দেননি ভেতরে ভেতরে নির্মাণ করে গেছেন, যাঁর ছিলো ‘ফটোগ্রাফি মেমোরি’, দুনিয়াজুড়ে হানাফি মাজহাবের যে জয়জয়কার আম্মার ইবনে আবু মালেকের দৃষ্টিতে যাঁর সবচেয়ে বড় অবদান তিনিই হলেন ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.)। তাঁর মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ঈমাম আবু হানিফার(রহ.)’র মাজহাব। তিনি ছিলেন, বাদশাহ মাহদী – হাদী – এবং হারুনুর রশিদের প্রধান বিচারপতি (কাজিউল কোজ্জা)। আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন,’আমি সর্ব প্রথম হাদিস লিখেছি ঈমাম আবু ইউসুফ হতে’।
তিনি আরো বলেছেন,’যে হাদিস ইয়াহইয়া ইবনে মঈনের অজানা সেটি হাদিস নয়’। সে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ছিলেন ঈমাম আবু ইউসুফের উজ্জ্বল তারকাময় ছাত্র। উন্নতির এই স্বর্ণ শিখরে পৌঁছলেন কী করে? কোনো যাদুমন্ত্র নয়, শুধুই ছিলো তাঁর কঠোর সাধনা। সাধনায় ডুবে থাকতেন তিনি ঈমাম আবু হানিফা (রহ.)’র দরবারে। সতেরো বছর ছায়ার মতো অনুসরণ করেন ঈমাম আজমকে। দুই ঈদেও সঙ্গ ত্যাগ করেননি। একদিন তাঁর সন্তান মারা গেল। সন্তানের দাফন কাফনের দায়িত্ব আত্মীয় প্রতিবেশীদের নিকট ছেড়ে দেন। কিন্তু নিজে এক নজর দেখতে গেলেন না। কারণ পুত্র হারানোর বেদনা তিনি ভুলতে পারবেন, কিন্তু ঈমামের পাঠ হারানোর বেদনা কোনদিন ভুলতে পারবেন না।
এই ঈমাম আবু ইউসুফ ক্ষুদ্র এক দোকানির সন্তান। সাধনায় পরিণত হন জ্ঞানের মহাকাশের এক সুপারনোভায়।
হাদিস শাস্ত্রের প্রথম গ্রন্থ ঈমাম মালেক (র.) রচিত ‘মুয়াত্তা’। ঈমাম শাফেঈ (রহ.) বলেছেন,’কোরআনের পর ‘মুয়াত্তা’ই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ’। (তখন ঈমাম বোখারী ও ঈমাম মুসলিম দুনিয়াতে শুভাগমন করেননি)।
ঈমাম মালেক (র.)’র ‘মুয়াত্তা’ লেখকদের ভাগ্যবান ছাত্র ইয়াহইয়া আন্দালুসি। যিনি স্পেনে মালেকী মাজহাবের প্রসার ঘটান।তিনি কী করে এত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হলেন? বিষয়টি সাধনার। তরুণ বয়সে জ্ঞান সাধনার লক্ষ্যে স্পেন হতে মদিনায় হাজির হয়ে যোগ দেন ঈমাম মালেক (র.)’র পাঠশালায়। হঠাৎ একদিন উট ঘোড়ার দেশে এল হাতি। সবাই হাতি দেখতে ঈমামের পাঠশালা হতে ছুটে গেল। শুধুই জ্ঞান আহরণের নেশায় ঈমামের দিকে চাতকের মত চেয়ে থাকতেন ইয়াহইয়া। ঈমাম মালেক পরম মমতায় তাঁকে কাছে ডেকে বললেন, ‘যাও তুমিও হাতি দেখে এসো’। উত্তরে তিনি উস্তাদকে যা বলেছিলেন, তা জগতের জ্ঞান পিপাসুদের হৃদয়ে এঁকে রাখার মত কথা। তিনি বলেছেন,’সুদূর আন্দালুসিয়া (স্পেন) হতে আমি হাতি দেখতে আসিনি, এসেছি আপনার নিকট যে নবীজির অমূল্য সম্পদ ‘জ্ঞান’ রয়েছে তা ডুবুরির মতো আহরণ করে আজলা পূর্ণ করতে’।
দুনিয়ার সেরা নেশা জ্ঞান সাধনার নেশা। এই নেশা ডুবুরির মুক্তা খোঁজার চেয়ে আকর্ষণীয়। ডুবুরি মুক্তা খুঁজে মৌসুমে। আঁজলা পূর্ণ হলে আর ডুব দেয় না অথৈজলে। জ্ঞান অনুসন্ধানীর মৌসুম নেই, আঁজলার পরিমাণ নেই। এই স্বাদে অতৃপ্ত থাকে অন্বেষণকারী।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘দুই তৃষ্ণণার্থ ব্যক্তির তৃষ্ণা কখনো নিবারণ হবে না। জ্ঞান ও সম্পদের তৃষ্ণা’।
হাদিসের পর হাদিস বর্ণনা করে জিহ্বাটা শুকিয়ে তৃষ্ণার্থ হয়ে পড়তেন ঈমাম আবু দাউদ (রহ.)। অলিকুল সম্রাট সাহল তুসতারী (রহ.) একদিন ঈমাম আবু দাউদের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, ‘আপনার নিকট একটি বিনীত আবেদন আছে। কিন্তু কথা দিতে হবে আবেদনটি প্রত্যাখ্যান হবে না’। ঈমাম বললেন, ‘কথা দিলাম, সম্ভব হলে পূর্ণ করবো’। হযরত তুসতারী বললেন, ‘যে জিহ্বা দিয়ে মহাকালের মহানবী (দ.)’র পবিত্র হাদিস সাধনার স্বাদ নেন, সে জিহ্বটা বের করে দিন আমি চুমু খাব’। তিনি জিহ্বাটা বের করেন, হযরত তুসতারী (রহ.) তাতে চুমু খেয়ে হাদিসের স্বাদ নেন। এই স্বাদ এক অমৃত স্বাদ, শুধু গ্রহণে সক্ষম সাধকগণ।
হযরত গালেব কাত্তান (রহ.) ব্যবসা করতে কিছুদিনের জন্য কুফা যান। অবসরে কিছু হাদিস অাত্মস্থ করতে যেতেন ঈমাম আবু হানিফা (রহ.)’র শিক্ষক ঈমাম আমাশের দরবারে। শিখে নেন বিপুল পরিমান হাদিস। একদিন ব্যবসার কাজ শেষ হলে বসরায় ফিরে যাওয়ার রাতটি ঈমাম আমাশের খেদমতে উৎসর্গ করতে হাজির হন। ঈমাম তাহাজ্জুদ নামাজের পর সূরা আলে ইমরানের ১৮ নম্বর আয়াতটি বার বার পাঠ করতে থাকেন। গালেব কাত্তান জানাতে চাইলেন,এই আয়াতটি সম্পর্কে নবীজির কোনো হাদিস আছে? ঈমাম বললেন, ‘আল্লাহর কসম করে বলছি, এক বছর পর্যন্ত হাদিসটি আমি বর্ণনা করবো না’। একটি হাদিস শুনতে গালেব কাত্তান (রহ.) বাড়ি ফেরা বন্ধ রাখেন। একদিন একদিন করে যেদিন এক বছর পূর্ণ হলো, সেদিন হাদিসটি জানতে চাইলেন। ঈমাম বললেন, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই আয়াতটি নিয়মিত পাঠ করবেন, তিনি যখন কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট হাজির হবেন তখন তাঁকে আল্লাহ পাক জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিবেন’। অপেক্ষা কঠিন হলেও একটি হাদিসের জ্ঞান অর্জনের জন্য পূর্ণ এক বছর অপেক্ষা করে জগতের মানুষকে শিক্ষা দিয়ে গেলেন ইসলামে জ্ঞান সাধনায় রয়েছে অমৃত সুধা। (চলমান)
-বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট