বার্ধক্য বনাম ছেলে মেয়েঃ একটি আত্মোপলব্ধি

0
99
 তারেকুল আলম:
বার্ধক্য বয়সে প্রত্যেকের একমাত্র ও অদ্বিতীয় অবলম্বন হচ্ছে সন্তান। এটা শেষ আশ্রয়স্থল বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। মানুষ হয়তো শেষ বয়সে কথিত ঐ আশ্রয়ের জন্য সন্তান জন্ম দেয় এবং সারা জীবন খেয়ে না খেয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তাদের মানুষ করে কিন্তু আমরা সন্তান হিসেবে শেষ পর্যন্ত কতটা মানুষ হতে পারি? পিতা-মাতা আমাদের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করে তাদের বার্ধক্যে আমরা কি তার সিকি ভাগও করতে পারি? বার্ধক্যে মানুষ শিশু সূলভ আচরণ করে। এটা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য কিন্তু আমরা তাদের কতটুকু মানিয়ে নিতে পারি?
একটা ছোট শিশু যেমন আচরণ করে মানুষ বার্ধক্যে ঠিক তেমন আচরণ করে। এটা খাওয়া দাওয়া সব কিছুতে প্রকাশ পেতে পারে। আমাদের সন্তান খেতে না চাইলে আমরা জোর করে বা তাদের পছন্দ মতো খাবার এনে খাওয়ানোর চেষ্টা করি কিন্তু এটা কি আমরা আমাদের বৃদ্ধ পিতা -মাতার বেলায় কখনো ভেবে দেখেছি? হয়তো কেউ কখনো চিন্তাও করি নাই। সন্তান হিসেবে প্রত্যেক ছেলে মেয়ে তাদের পিতা- মাতার মঙ্গল কামনা করে এবং তাদের সেবা যত্নের খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ একজন মেয়ে হিসেবে আমরা কতটুকু আমাদের শশুর-শাশুড়ী কে আপন করে নিতে পারি?
আমরা নিজের মা-বারার জন্য যে ভালবাসা ও সেবা যত্ন প্রত্যাশা করি তা কি নিজের শশুর-শাশুড়ীর জন্য অনুভব বা প্রত্যাশা করি? আর সন্তান হিসেবে ঘরের প্রতিবন্ধকতা অর্থাৎ নিজের স্ত্রীর প্রতিবন্ধকতা বা তার মন রক্ষা করে আমরা কতটুকু পারি, মা- বাবার সেবা যত্ন করতে। যাদের একাধিক সন্তান আছে তারা বার্ধক্যে পৌঁছে পিতা-মাতা হিসেবে কোন ধরনের বাস্তবতা বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়? বার্ধক্যে পিতা- মাতা কোথায়? কোন পরিবেশে ও কোন সন্তানের কাছে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং ঐ বিশেষ সন্তানের কাছে থাকতে কেন সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? নাকি নিরুপায় হয়ে ওখানে থাকতে হচ্ছে? আমরা সন্তান হিসেবে কখনও কি এসব প্রশ্ন ভেবে দেখেছি? যদি সন্তান থাকার পরও বার্ধক্যে কোন পিতা-মাতাকে এসব নিয়ে ভাবতে হয় এসব বিষয় তাদের পীড়া দেয় এবং নিরাপদ বোধ না করেন তাহলে সন্তান কেন? কার জন্য সন্তান? বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এই প্রশ্ন আসা একেবারে অবান্তর নয়। তারপরও সন্তানের অপরিহার্যতা রয়েছে।
তারপরও আমাদেরকে একটা সময় বা বার্ধক্যে সন্তানের উপর নির্ভর করতেই হবে। এর বিকল্প কিছু নাই। আবার সন্তানের অপরিহার্যতা থাকলেও কতজন সন্তান আমাদের দরকার? একাধিক সন্তান থাকলে বার্ধক্যে কি কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়? এসব বিষয়ও ভেবে দেখা দরকার। হয়তো তারা পরিবেশ পরিস্থিতি ও ভালো লাগা বিবেচনা করে কোন একটা সন্তানের কাছে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সেটা সেই সন্তানকে ভালো লাগা বিবেচনা করে নাও হতে পারে। সেটা হয়তো ঐশ্বরিক অথবা বস্তুগত সংযোগ বা মায়ার টানেও হতে পারে । বেশি সন্তান থাকলে পিতা- মাতা কোন একজনের কাছে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করলে হয়তো অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনা করে সেই সন্তান পিতা- মাতার প্রতি অসন্তুুষ্ঠ হতে পারে।
যদি সেই সন্তান এটা তার জন্য সৌভাগ্য বা নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ না করে। আজ আমরা নিজেদের সন্তানের জন্য যতটুকু কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তাদের জন্য যে সম্পদ গড়ে তোলা ও রেখে যাওয়ার চেষ্টা করছি আমাদের পিতা- মাতা কি সেই চেষ্টা আমাদের জন্য করেন নাই? তাহলে কেন একটা নির্দৃষ্ট সময় এসে তারা আমাদের কাছে বোঝা হয়ে যায়? আমরা কেন চিন্তা করি না তারাও একটা সময় আমাদেরকে বড় করে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। যা এখন আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য করতে মরিয়া হয়ে উঠেছি এবং সেই সন্তান জন্ম দিতে ব্যকুল হয়ে আছি। আমরা কেনইবা আমাদের স্ত্রীদের কাছে অন্তত পিতা- মাতার ব্যাপারে কঠোর হতে পারি না? এখানে কি পিতা- মাতার একাধিক সন্তান থাকার কূফল কাজ করে? আমি একমাত্র সন্তান হলে কি কোন ধরনের হীনমন্যতা কাজ করতো? নাকি তখন ঘরের বউ অথবা আর্থিক যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূরে সরিয়ে দিয়ে পিতা মাতার সেবা যত্ন করতে কোন ধরনের হীনমন্যতা কাজ করতো না?
মা- বাবার বিষয়ে কারো সাথে কোন ধরনের আপোষ করা যায় কিনা? করলে উচিত হবে কিনা? প্রত্যেকের এসব বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে। না হয় একটা সময় আসবে মানুষ সন্তানের প্রতি আস্তা হারিয়ে ফেলবে তখন মানুষ বন্য বা পশুত্বের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে! সন্তানের এই প্রয়োজনহীনতার কারণে মনুষ্য প্রজাতির বিলুপ্তিও ঘটতে পারে! পাশ্চাত্যের আধুনিক দেশগুলোতে মানুষ সন্তানের উপর নির্ভরশীলতা হারিয়ে ফেলেছে তারা এখন সন্তান ধারণ ও লালন- পালনে অনিহা বোধ করেন । পশ্চিমা বা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে তা এখন স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ফুটে উঠছে।