প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিএনপির কাছে আমার প্রত্যাশা: আজাদ জামাল

0
194
বিএনপির ৪২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির সকল স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অভিনন্দন জানাচ্ছি।এই কথা অবশ্যই মানতে হবে যে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম একটি বড় দল এবং এই দলটির লক্ষ কোটি কর্মী সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে।ব্যক্তিগতভাবে হয়তো বিএনপির আদর্শ মানতে না পারি কিন্তু বাস্তবতা মানতে নারাজ না।১৯৭৮ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার পর আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী রাজনৈতিক দল অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং মোক্ষম সুযোগে বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।যে কোন রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠান গঠনের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ থাকে এবং কোন নির্দিষ্ট আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করাই এ সংগঠনের প্রধান কাজ।প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কোন রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তি ছিলেন না,কখনো ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছেন তার কোন ইতিহাস নেই,কিন্তু তিনি একজন মেধাবী আর্মি অফিসার ছিলেন এবং সেই যোগ্যতা বলে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন।পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মেনে মুক্তিযুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। অবশ্য ২৫ শে মার্চ গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সেই ঘোষণা যথাক্রমে আবুল কাশেম সন্দীপী ও এম এ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।কিন্তু সেই উত্তাল মূহুর্তে আর্মি অফিসার হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা যুদ্ধের গতি বাড়িয়ে দেয় এটা নিঃসন্দেহ।
মেজর জিয়াউর রহমান একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক অন্যান্য বীরমুক্তিযোদ্ধাদের মতো বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত হন।যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই হয়েছিল তাই যুদ্ধ জয়ের পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক উপাধি পাওয়া এটা সঠিক ও সময়োপযোগী কাজ ছিল।জীবিত অবস্থায় মেজর জিয়া কখনো নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেন নি।আমি মেজর জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং দেশপ্রেম নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলতে পারিনা এবং কেউ করলে তাও সমর্থন করিনা।কিন্তু ৭৫ পরবর্তী ক্ষমতা দখলের পর থেকে মেজর জিয়া পরিবর্তন হতে থাকে এবং ইতিহাস ও তাই বলে। স্বাধীনতা বিরোধী,বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং দুর্নীতিবাজদের দলে নিয়ে সেদিন তিনি বিএনপি গঠন করেন।তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে সাড়ে ১১ হাজার চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে ছেড়ে দেন এবং কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ বন্ধ করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কুঠোরাঘাত করেন।পরবর্তীতে উনার সময়ে ছোট বড় ১৮ টি ক্যু পাল্টা ক্যু হয় এবং তিনি সফলভাবে তা মোকাবেলা করেন।৭ ই নভেম্বরের পরে তিনি প্রায় ৫-৬ হাজার সামরিক বাহিনীর অফিসার ও সদস্যদের কোর্ট মার্শাল করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন এবং ঐ অফিসারদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।এখনো অনেকের কবরের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি।মেজর জিয়ার সবচেয়ে গর্হিত কাজ ছিলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করা,তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দিয়ে মূলতঃ বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে চিহ্নিত হন।আমি জানি না একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি কেন এমন কাজ করলেন?সেদিন তিনি যদি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন তাহলে আজকের ইতিহাস অন্যরকম হতো।
মেজর জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্ননা করা আমার আজকের বিষয় নয়।১৯৮১ সালে সামরিক বাহিনীর হাতে মেজর জিয়ার মৃত্যুর পর তার দলের হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া।একজন গৃহবধূ থেকে তিনি একজন সফল রাজনীতিবিদ এবং দুই বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে উনার সাহসী ভূমিকার কারণে তিনি তখন আপোষহীন নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন।তারপর থেকে তিনি ও পরিবর্তন হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেন। চিহ্নিত ও কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়ে সমালোচনার ঝড় তুলেন। পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতায় ২০০১ এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে চিহ্নিত রাজাকারদের মন্ত্রী বানিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের পুরস্কৃত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কবর রচনা করেন।বিএনপি এখনো সেই ধারা থেকে বের হতে পারে নি।এখনো স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে নি।
২০০২ কি ২০০৩ সালে প্রখ্যাত কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরীর একটি কলাম “আপনারা কি একটি রাজনৈতিক দলের মৃত্যু দেখেছেন”।তিনি সেদিন বিএনপিকে সতর্ক করে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে রাজনীতি করার আহ্বান জানান,কিন্তু বিএনপির তৎকালীন নেতৃত্বে তা আমলে নেননি। বিএনপি স্বাধীনতা বিরোধী, জঙ্গি ও রাজাকারদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে এবং এদেশের কোটি কোটি মানুষের অন্তরে বিএনপির প্রতি ঘৃণার জন্ম হয়।এই মুহূর্তে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে এবং এরজন্য বিএনপির নেতৃত্ব দায়ী। বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং শীর্ষ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে শেখ মুজিব ছাড়া বঙ্গবন্ধু বলতে লজ্জা পায়,১৫ ই আগস্ট বিতর্কিত জন্মদিন পালন করে,এখনো স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে রাজনীতি করে।২১ আগস্টের দ্বায় কোন ভাবেই বিএনপি এড়াতে পারে না।
প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিএনপির প্রতি আমার প্রত্যাশা অন্তত বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা প্রত্যাহার,১৫ ই জন্মদিন পালন থেকে বিরত থাকা,২১ আগস্ট নিয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করা।স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করা। পরিশেষে বলবো আমি কোন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক নই তবুও আমি বিএনপি’র সফলতা কামনা করছি।বিএনপির নেতৃত্ব অতীতের ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে রাজনীতি করলে আবারো স্বরূপে ফিরতে পারে তাদের রাজনীতি।
লেখক: বিশিষ্ট সংগঠক ও ব্যাংকার